ঘরের মাঠের বিশ্বকাপটাই খেলতে পারলেন না মাশরাফি

শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ
শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ শাহাদাৎ আহমেদ সাহাদ , স্পোর্টস রিপোর্টার
প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ০৪ জুলাই ২০১৯

বরাবরই বাস্তববাদী বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। অতীত নিয়ে দুঃখ করার চেয়ে ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতেই বেশি পছন্দ করেন দেশসেরা এ অধিনায়ক। তাই নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ার কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে আক্ষেপের কোনো জায়গা রাখতে চান না তিনি, উপভোগ করার চেষ্টা করেন প্রতিটি মুহূর্ত।

তবু ঘুরে-ফিরে একটি আক্ষেপ রয়েই গেছে নড়াইল এক্সপ্রেস খ্যাত এ পেসারের। যা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় টাইগার অধিনায়ককে, জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয় ভেতরটাকে। চলতি বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতার দিক থেকে সবার চেয়ে এগিয়ে দুই দেশের দুই ক্রিকেটার- বাংলাদেশের মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল। শুধুমাত্র এ দুজনই খেলেছেন ২০০৩ সালের বিশ্বকাপে।

তবে একটি জায়গায় ঠিকই গেইলের চেয়ে পিছিয়ে মাশরাফি। সেটি হলো- ২০০৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সবগুলো আসরেই খেলেছেন গেইল কিন্তু ঘরের মাঠের ২০১১ সালের বিশ্বকাপটিতেই খেলতে পারেননি মাশরাফি বিন মর্তুজা। যে কারণে গেইল তার ক্যারিয়ারে ৫টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও, মাশরাফি খেলতে পেরেছেন কেবল ৪টিতেই। আর এ ২০১১ সালের বিশ্বকাপটি খেলতে না পারার আক্ষেপই এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় টাইগার অধিনায়ককে।

ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করে বারবার ক্রিকেট মাঠে ফিরে আসা মাশরাফি, সেবার অনেক চেষ্টা করেও পারেননি জাতীয় দলে ফিরতে, বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা করে নিতে। আর সেবার বাদ পড়ার কারণ বোলার মাশরাফির ইনজুরি নয়, ব্যাটসম্যান মাশরাফির ইনজুরির কারণেই বিশ্বকাপের দলে নিজের নাম ওঠাতে পারেননি দেশসেরা এ পেসার।

নিজের চিরসঙ্গী হাঁটুর ইনজুরির কারণে অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচের পর আর খেলতে পারেননি মাশরাফি। তবে সেবারের চোট অতোটা গুরুতর না হওয়ায়, তার আশা ছিলো বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার আগেই নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলবেন বিশ্বকাপের।

সে ধারাবাহিকতায় নিজের ফিটনেসের প্রমাণ দিতে অংশ নেন ঢাকা লিগে। তারিখটা ছিলো ২১ ডিসেম্বর ২০১১, মাসখানেক পর ঘোষণা করা হবে বিশ্বকাপের স্কোয়াড। বিকেএসপির মাঠে বিকেএসপির বিপক্ষেই ব্যাটিংয়ে নেমেছিলেন আবাহনীর মাশরাফি। একটি বল আলতো করে ঠেলে দেন অনসাইডে, দৌড় শুরু করেন রানের জন্য। কিন্তু কয়েক গজ যেতেই অপর প্রান্তের ব্যাটসম্যান ফিরিয়ে দেন তাকে, নিজের পপিংক্রিজে ফেরার জন্য ঘুরতে গিয়েই ঘটে বিপত্তি।

হাঁটুর ওপর পড়ে বাড়তি চাপ, পা অনেকটা ঘুরে পড়ে যান পিচের ওপরেই। ওদিকে তাকে রানআউট করেন উইকেটরক্ষক লিটন কুমার দাস। কিন্তু উদযাপনের বদলে সেদিনের বিকেএসপির তরুণ ক্রিকেটাররা দৌড়ে যান পিচের ওপরে পড়ে থাকা মাশরাফির অবস্থা দেখতে। কারণ ম্যাচে প্রতিপক্ষ হলেও, বৃহত্তর স্বার্থে মাশরাফি ছিলেন তখন বিশ্বকাপ স্কোয়াডের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। তাই মাঠের মধ্যে তাকে এমনভাবে পড়তে দেখে কেউই স্বাভাবিক থাকতে পারেননি।

এমনকি বারবার ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করে জেতা যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত, সেই মাশরাফিও ভেঙে পড়েছিলেন সেদিনের পর। যা বোঝা যাচ্ছিল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াতে। নিজের ব্যাটিং গ্লাভস, হেলমেট মাঠের মধ্যেই ছুড়ে ফেলে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ড্রেসিংরুমের উদ্দেশ্যে। যেনো বুঝতে পারছিলেন, ঘটে গেছে অঘটন। পরে সেদিন রাত্রেই এক্স-রে করা হয় পায়ের, করা হয় আরও পরীক্ষানিরীক্ষা। পরদিন সকালেই নিশ্চিত হয়ে যায়, হয়তো বিশ্বকাপে আর খেলা হবে না মাশরাফি।

তবু মনের জোর বাকি ছিল সদা লড়াকু মানসিকতাসম্পন্ন মাশরাফির। তাই এক মাসের মধ্যেই নিজেকে ফিট প্রমাণ করার প্রায় অসম্ভব এক মিশনে নেমে যান তিনি। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়াম লাগোয়া একাডেমি মাঠে কঠোর পরিশ্রম করে ফিরিয়ে আনেন ফিটনেস। যেদিন ঘোষণা করা হয় বিশ্বকাপের স্কোয়াড, তখনও ফিজিওর কাছ থেকে পেয়েছিলেন অন্তত ৭০ শতাংশ ফিটনেসের সার্টিফিকেট।

কিন্তু তাকে ফিটনেসের অজুহাতেই স্কোয়াডের বাইরে রাখেন তখনকার নির্বাচকরা। ১৯ জানুয়ারি তারিখে বিসিবি কার্যালয়ে যখন ঘরের মাঠের বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করছিলেন নির্বাচকরা, তখনও একাডেমি মাঠে অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন মাশরাফি। আর আশায় ছিলেন বিশ্বকাপ দলের জায়গা পাওয়ার।

সেদিন সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকেই জানতে পারেন স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়ার খবর। শুরুতে নিজেকে সামলে নেন, কিন্তু পারেননি নিজের আবেগ ধরে রাখতে। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মাশরাফি। সেদিন পেশাদারিত্ব ভুলে গিয়ে পেশাদার সাংবাদিকরাও যেন যোগ দেন মাশরাফির এ শোকে। সবারই ভেতরটা যেন পুড়তে থাকে স্কোয়াডে মাশরাফি না থাকার দুঃখে।

সে ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো শেষ হয়ে গেল মাশরাফির ক্যারিয়ার। আর কখনোই ফেরা হবে না দেশসেরা এ পেসারের। কিন্তু এত সহজেই হার মেনে নিতে রাজি ছিলেন না তিনি। তাই তো বিশ্বকাপের পরপরই ফেরেন জাতীয় দলে, খেলতে থাকেন সব ইনজুরি জয় করে।

আর নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! ঘরের মাঠে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া মাশরাফিই, অধিনায়ক হয়ে খেলেন ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ। এমনকি দেশের ইতিহাসের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে পরপর দুই বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেয়ার কৃতিত্বও দেখান মাশরাফি।

তার অধীনেই ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য, কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে বাংলাদেশ। ধারাবাহিকতা ধরে রেখে এবারের বিশ্বকাপে লক্ষ্য ছিলো সেমিফাইনালে খেলা। সেটি পূরণ হয়নি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলের বিপক্ষে মিলেছে দাপুটে জয়। শুক্রবার পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় পেলেই বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ইতিবাচক সমাপ্তি ঘটবে দেশের ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক মাশরাফির।

এসএএস/পিআর