স্টেডিয়ামে ইসলামবিদ্বেষী স্লোগান: ক্ষুব্ধ লামিনে ইয়ামাল
স্পেন জাতীয় ফুটবল দলের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল স্পেন-মিশর প্রীতি ম্যাচে ইসলামবিদ্বেষী স্লোগানের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্পেন ও মিশরের মধ্যকার ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় বার্সেলোনার আরসিডিই স্টেডিয়ামে, যেখানে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে দর্শকদের বিতর্কিত আচরণের কারণে।
ম্যাচের প্রথমার্ধে গ্যালারি থেকে ইসলামবিদ্বেষী স্লোগান ভেসে আসে, যা সরাসরি ইয়ামালকে উদ্দেশ্য করে না হলেও মুসলিম ধর্মাবলম্বী এই ফুটবলারের ওপর মানসিকভাবে প্রভাব ফেলে। মিশর একটি মুসলিমপ্রধান দেশ এবং ইসলাম তাদের রাষ্ট্রধর্ম হওয়ায় এই স্লোগানগুলোকে ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
ইনস্টাগ্রামে নিজের প্রতিক্রিয়ায় ইয়ামাল বলেন, ‘আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ। স্টেডিয়ামে তুমি যদি লাফ না দাও, তবে তুমি মুসলিম- এমন স্লোগান দেওয়া হয়েছে। আমি জানি এটা প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত কিছু নয়; কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে এটা অসম্মানজনক এবং একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব সমর্থক এমন নয়, আমি তা বুঝি; কিন্তু যারা ধর্মকে ব্যবহার করে অন্যদের বিদ্রূপ করে, তারা অজ্ঞ এবং বর্ণবাদী মানসিকতার পরিচয় দেয়। ফুটবল উপভোগের জন্য, সমর্থন দেখানোর জন্য- কাউকে তার বিশ্বাস বা পরিচয়ের জন্য অসম্মান করার জন্য নয়।’
১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল ইতোমধ্যেই স্পেন দলের অন্যতম বড় তারকা হয়ে উঠেছেন। বার্সেলোনায় জন্ম নেওয়া এই উইঙ্গারের বাবা মরক্কোর এবং মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির নাগরিক হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি স্পেনের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। তিনি ইতোমধ্যে উয়েফা ইউরো-২০২৪ এ স্পেনের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬ এও বড় ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ঘটনার পর বার্সেলোনার স্থানীয় পুলিশ বাহিনী ‘মোসোস’ নিশ্চিত করেছে যে তারা ম্যাচে সংঘটিত ইসলামবিদ্বেষী স্লোগান নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। নিয়ম অনুযায়ী রেফারি, ম্যাচ ইন্সপেক্টর, নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের রিপোর্ট এবং ভিডিও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে স্পেনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কাতালোনিয়ার ক্রীড়ামন্ত্রী বার্নি আলভারেজ এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক ও গুরুতর ঘটনা। আমরা ইয়ামালের পাশে থাকব। যা হয়েছে তা খেলাধুলার চেতনাকে পিছিয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসব স্লোগান পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং যারা এতে জড়িত, তাদের অনেকেরই খেলাধুলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি আয়োজক সংস্থা রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন ও কাতালান ফুটবল ফেডারেশন-এর সমালোচনা করে বলেন, যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার মতে, প্রথম স্লোগানের পরই ম্যাচ থামিয়ে দেওয়া উচিত ছিল এবং প্রয়োজনীয় প্রোটোকল চালু করা উচিত ছিল।
ম্যাচ চলাকালীন ইজিপ্টের জাতীয় সংগীতের সময়ও দর্শকদের শিস দেওয়া হয়। পরে কিছু দর্শক ‘Musulmán el que no bote” (যদি লাফ না দাও, তবে তুমি মুসলিম)- এই স্লোগান দেয় এবং বিরতির সময় কিছু মিশরীয় খেলোয়াড় মাটিতে সিজদা করলে আবারও শিস দেওয়া হয়।
বিরতির সময় স্টেডিয়ামের স্ক্রিনে এবং ঘোষকের মাধ্যমে দর্শকদের এসব আচরণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও একই বার্তা পুনরায় দেওয়া হয়, যদিও তখনও কিছু অংশ থেকে শিস শোনা যায়।
স্টেডিয়ামের স্বাগতিক ক্লাব আরসিডি এস্পানিওল এক বিবৃতিতে এসব আচরণকে ‘বর্ণবাদী’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই ধরনের ঘটনা খেলাধুলার মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেছে, একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো ক্লাব বা সমর্থকদের দায়ী করা অন্যায্য। তাদের মতে, ১২৫ বছরের ইতিহাসে এস্পানিওলের সমর্থকরা সবসময়ই বৈচিত্র্য, সম্মান ও সহাবস্থানের উদাহরণ স্থাপন করেছে।
আইএইচএস/