বিশ্বকাপ ফুটবলে ইরাক

৪০ বছর পর বিশ্বমঞ্চ মাতাতে প্রস্তুত নতুন এক ‘লায়নস অব মেসোপটেমিয়া’

স্পোর্টস ডেস্ক
স্পোর্টস ডেস্ক স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:০৯ পিএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬

দীর্ঘ চার দশকের অপেক্ষা শেষ। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর আবারও উত্তর আমেরিকার মাটিতে (২০২৬) বিশ্বসেরাদের লড়াইয়ে ফিরছে ইরাক। গ্রাহাম আরনল্ডের অধীনে এক নতুন প্রতিভাবান প্রজন্মের হাত ধরে ইরাকি ফুটবল এখন স্বপ্ন দেখছে মেক্সিকো প্রজন্মের ছায়া কাটিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার।

‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’ নামে পরিচিত দলটির বিশ্বকাপ ইতিহাস ও সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

মেক্সিকো ইরাকি ফুটবলের জন্য এক চিরস্মরণীয় স্মৃতি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে স্বাগতিক মেক্সিকান ফুটবলার ফার্নান্দো কুইরার্তের এক ভলিতে ইরাকের বিদায় নিশ্চিত হয়েছিল। চার দশক পর আবারও তারা বিশ্বমঞ্চে ফিরছে, এবার উত্তর-পূর্ব মেক্সিকোর মনতেরে শহরে অনুষ্ঠিত প্লে-অফ টুর্নামেন্টে বলিভিয়ার মত দলকে হারিয়ে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে তারা।

১৯৮৬ সাল থেকে ২০২৬- ৪০ বছরের এই দীর্ঘ সময়জুড়ে ইরাক অলিম্পিকে দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে এবং এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। কিন্তু বিশ্বকাপে ফেরার লক্ষ্যে বারবার ব্যর্থ হয়েছে।

১৯৮৬ সালের সেই ‘মেক্সিকো প্রজন্ম’, যেখানে আহমেদ রাধি, হুসেইন সাঈদ ছিলেন, তাদের ছায়া এখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়- আমির আম্মারি, আমিন হুসেইনদের নেতৃত্বে দলটি এবার উত্তর আমেরিকায় নিজেদের প্রমাণ করতে প্রস্তুত।

কোচ প্রোফাইল: গ্রাহাম আরনল্ড

সকারুজদের (অস্ট্রেলিয়া) সাবেক কোচ গ্রাহাম আরনল্ড এখন ইরাকের ডাগআউটে। কাতার বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে শেষ ষোলোয় নিয়ে যাওয়া এই কোচ এখন দ্বিতীয় কোনো দেশকে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন। তার আক্রমণাত্মক কৌশল ইরাকের বাছাইপর্বের শেষদিকের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে মূল ভূমিকা পালন করেছে।

Iraq Coach

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে রেকর্ড ৭২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে কোচিং করিয়েছেন গ্রাহাম আর্নল্ড। তিনি একই কনফেডারেশনের দুটি ভিন্ন দলকে বিশ্বকাপে কোচিং করানো বিরল কোচদের তালিকায় যোগ দিতে যাচ্ছেন এবার। অস্ট্রেলিয়ার দায়িত্ব ছাড়ার সাত মাস পর হেসুস ক্যাসাসের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইরাকের দায়িত্ব নেন এবং এই দলটির বিশ্বকাপে ওঠার সম্ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে ইরাকের গ্রুপ ও সময়সূচী

ইরাক গ্রুপ পর্বে বেশ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবে। তাদের ম্যাচগুলো হলো:

১৬ জুন: ইরাক বনাম নরওয়ে (বোস্টন স্টেডিয়াম)
২২ জুন: ফ্রান্স বনাম ইরাক (ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম)
২৬ জুন: সেনেগাল বনাম ইরাক (টরন্টো স্টেডিয়াম)

যেভাবে বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করল ইরাক (রোড টু ২০২৬)

সিয়েরা মাদ্রে ওরিয়েন্টাল পর্বতমালার ঘেরা মনতেরে শহর ছিল ইরাকের দীর্ঘ ও কঠিন যাত্রার শেষ ধাপ। বসরা, হ্যানয়, ম্যানিলা, জাকার্তা, কুয়েত সিটি, সিউল, মাসকাট, আম্মান, জেদ্দা ও আবুধাবি- এসব শহর পেরিয়ে তারা ২১ ম্যাচের এক দীর্ঘ বাছাইপর্ব শেষ করে অবশেষে বিশ্বকাপের মঞ্চে।

শুরুটা ছিল দুর্দান্ত- টানা ছয় ম্যাচ জিতে এএফসি বাছাইপর্বের দ্বিতীয় রাউন্ড সহজেই পেরিয়ে যায়। তবে তৃতীয় রাউন্ডের মাঝামাঝি সময়ে পয়েন্ট হারানোর কারণে কোচ কাসাসকে বিদায় নিতে হয়।

Iraq

সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া থেকে মাত্র এক পয়েন্টের জন্য পিছিয়ে পড়ে ইরাক। এরপর তারা চতুর্থ রাউন্ডে একটি ত্রিদেশীয় লড়াইয়ে অংশ নেয়। সেখানে ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বাগতিক সৌদি আরবের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র এবং ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ১-০ জয়ের পরও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে তারা।

পঞ্চম রাউন্ডে লড়াই আরও কঠিন হয়ে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে দ্বিতীয় লেগের অতিরিক্ত সময়ের ১৭তম মিনিটে আমির আল আম্মারির পেনাল্টি গোল দলকে প্লে-অফ টুর্নামেন্টে তুলে দেয়।

প্লে-অফের ফাইনালে লাতিন আমেরিকান দল বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করে ইরাক। সেই ম্যাচে গোল করেন আল আল হামাদি ও আইমেন হুসেইন, আর বলিভিয়ার হয়ে গোল করেন মইসেস পানিয়াগুয়া।

বিশ্বকাপে ইরাকের ইতিহাস

কনফেডারেশন: এএফসি
সেরা ফল: গ্রুপ পর্ব (১৯৮৬)
সর্বশেষ অংশগ্রহণ: মেক্সিকো ১৯৮৬ (গ্রুপ পর্ব)
প্রথম অংশগ্রহণ: মেক্সিকো ১৯৮৬
বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ: ২ বার (১৯৮৬, ২০২৬)
সামগ্রিক রেকর্ড: ম্যাচ ৩, জয় ০, ড্র ০, হার ৩, গোল: পক্ষে ১টি, বিপক্ষে ৪টি

বিশ্বকাপে ইরাক

বর্তমান কোচের জন্মের ১০ বছর পর, তার নিজ শহরেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচ খেলেছিল ইরাক জাতীয় ফুটবল দল। ১৯৭৩ সালের মার্চে সিডনির পুরনো স্পোর্টস গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলে হেরে যায় তারা।

পরবর্তী আসরের বাছাইপর্ব থেকে সরে দাঁড়ানো এবং ১৯৮২ বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হওয়ার পর, অবশেষে ১৯৮৫ সালের শেষ দিকে সিরিয়াকে দুই লেগে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে তারা প্রথমবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে (১৯৮৬) জায়গা করে নেয়।

Iraq

ছয় মাস পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে অচেনা হলুদ জার্সি পরে মেক্সিকোর টলুকায় প্যারাগুয়ের বিপক্ষে প্রথম মাঠে নামে ইরাক, যা তাদের বিশ্বকাপ অভিষেক এবং আরব দেশ হিসেবে ষষ্ঠ অংশগ্রহণ। প্রথমার্ধের শেষ দিকে রোমেরিতোর চিপ শটে পিছিয়ে পড়ে ইরাক। তবে দলটি মোটেই একপেশে খেলেনি; খলিল আলাউই এবং হুসেইন সাঈদ দু’জনেই গোলের খুব কাছে পৌঁছেছিলেন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইনজুরির কারণে সেই ম্যাচের পরই হুসেইন সাঈদের টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যায় এবং তাকে দেশে ফিরে যেতে হয়। তার জায়গায় দলে আসেন করিম সাদ্দাম। দ্বিতীয় ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তিনি আক্রমণভাগে খেলেন আহমেদ রাধির সঙ্গে।

ওই ম্যাচে এনজো স্কিফোর জোরালো শট এবং নিকো ক্লাইসেনের পেনাল্টিতে বেলজিয়াম এগিয়ে যায়। তবে ইতিহাস গড়েন আহমেদ রাধি, যিনি ইরাকের হয়ে বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত একমাত্র গোলটি করেন।

মিডফিল্ডার বাসিল জর্জিস লাল কার্ড দেখার ছয় মিনিট পর, নাতিক হাসিমের পাস নিয়ন্ত্রণ করে রাধি শক্তিশালী শটে বল জালে জড়ান, যা গোলরক্ষক জিয়ান ম্যারি ফাফকে পরাস্ত করে।

শেষ ম্যাচে টলুকা থেকে মেক্সিকো সিটিতে গিয়ে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হয় ইরাক। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফার্নান্দো কুইরার্তের গোলে মেক্সিকো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং জয় নিশ্চিত করে।

শেষ পর্যন্ত ইরাক তিন ম্যাচেই হেরে এবং মাত্র একটি গোল করে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। তবে পরিসংখ্যানের বাইরে একটি সত্য হলো- ব্রাজিলে দুর্বল প্রস্তুতির পরও দলটি প্রতিটি ম্যাচেই লড়াই করেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিল।

এখন নতুন প্রজন্মের সামনে সুযোগ এসেছে- উত্তর আমেরিকায় ফিরে এসে ইরাকের বিশ্বকাপ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখার।

বিশ্বকাপে ইরাকের রেকর্ডধারীরা

১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইরাক ফুটবল দলের তিনটি ম্যাচেই সাতজন খেলোয়াড় অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছয়জন শুরু থেকেই খেলেছিলেন এবং রহিম হামিদ তিন ম্যাচেই বদলি হিসেবে মাঠে নামেন।

Iraq

দুঃখজনকভাবে, সেই খেলোয়াড়দের মধ্যে চারজন- আহমেদ রাধি, ডিফেন্ডার নাদিম শাকের এবং মিডফিল্ডার আলি হুসেইন শিহাব ও নাতিক হাসিম পরে মৃত্যুবরণ করেন। এখন জীবিত আছেন কেবল ফুল-ব্যাক খলিল আলাউই, ঘানিম ওরাইবি এবং হামিদ- যারা বিশ্বকাপের সব ম্যাচে ইরাকের হয়ে খেলেছিলেন।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে করা গোলের সুবাদে আহমেদ রাধি-ই এখন পর্যন্ত একমাত্র ইরাকি ফুটবলার, যিনি বিশ্বকাপে গোল করেছেন। সেই রেকর্ড ভাঙার লক্ষ্য নিয়ে এগোবেন বর্তমান প্রজন্মের তারকা আইমেন হুসেইন ও মোহানাদ আলিরা।

মেক্সিকো প্রজন্মের ছায়া ইরাকি ফুটবলে দীর্ঘ সময় ধরে ছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রাহাম আরনল্ডের এই দলটির লক্ষ্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং ১৯৮৬ সালের সেই ৩ হারের রেকর্ড মুছে প্রথম জয় এবং নক-আউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া।

আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।