বইয়ের পাতা থেকে স্ক্রিনের ফাঁদে শিক্ষার্থীরা
সাজেদুল ইসলাম রাব্বি
একজন শিক্ষার্থীর প্রধান এবং অন্যতম দায়িত্ব হলো বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। বইয়ের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পৃক্ততা থেকেই জন্ম নেয় নতুনত্ব, বেড়ে ওঠে সৃজনশীলতা এবং গড়ে ওঠে গভীর ও ইতিবাচক চিন্তার অভ্যাস। কিন্তু সেই বই ধীরে ধীরে সরে গিয়ে আজকাল জায়গা করে নিচ্ছে রিল, শর্ট ভিডিও ও অবিরাম স্ক্রলিংয়ে। তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ সময় কি যথাসাধ্য কাজে ব্যয় হচ্ছে, নাকি চিন্তার ক্ষমতাই কেবল ক্ষয় হচ্ছে?
বললে ভুল হবে না, এই পতনের শুরুটা হয় স্যোশাল মিডিয়া স্ক্রল থেকেই। একসময় যে শিক্ষার্থী নিজে ভাবতে পারত, নিজে শিখত, নিজেই নতুন কিছু তৈরি করত, আজ সে সামাজিক মাধ্যমে কেবল দেখে, প্রতিক্রিয়া দেয় আর স্কিপ করে চলে যায়। ভাবনার জায়গায় এখন আর সৃষ্টি নেই, আছে শুধু গ্রহণ আর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে সে তার প্রোডাক্টিভিটি হারাচ্ছে। এছাড়াও শর্ট কনটেন্টের জাল এক ধরনের ভয়ংকর ফাঁদ। বিনোদন কনটেন্ট মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয়, ডোপামিনের দ্রুত নিঃসরণ ঘটায় এবং ধীরে ধীরে আসক্তি তৈরি করে। এর প্রভাবেই গভীর চিন্তার প্রতি অনীহা জন্ম নেয়। একজন শিক্ষার্থী যখন নতুন কিছু ভাবতে বসে, তখনই সে বিরক্ত বোধ করে। এতে স্পষ্ট হয়, সে যা নিয়মিত করছে, সেটাই তার মন ও মস্তিষ্কের অবস্থান নির্ধারণ করছে।
শিক্ষার্থীর মনোযোগ ভাঙনের বিষয়টি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। একসময় যে শিক্ষার্থী এক ঘণ্টার শিক্ষণীয় কনটেন্ট ধৈর্য ধরে দেখতে পারত, আজ সে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও দেখেই অস্থির হয়ে পড়ে। পাঁচ মিনিটের একটি লেখা পড়ার মতো ধৈর্য তার নেই। তার ভাবনার কাঠামো এমনভাবে তৈরি হয়ে গেছে যে, যে কোনো কিছু স্কিপ করাই যেন তার স্বাভাবিক অভ্যাস। তখন প্রশ্ন আসে, নতুন আইডিয়া কেন জন্ম নিচ্ছে না?
বাস্তবতা হলো, আইডিয়ার জন্ম হয় নিরবতা থেকে, একঘেয়ে ভাবনা থেকে, গভীর মনোযোগ থেকে। কিন্তু অবিরাম স্ক্রলিং এই তিনটিকেই ধ্বংস করছে। ব্যক্তি অন্য সব অর্থবহ এক্টিভিটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় স্পেস সে আর তৈরি করতে পারছে না। অন্যের বানানো কনটেন্টই তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। মূলত সংকটের জায়গাটা এখানেই। এভাবেই সৃজনশীলতার নীরব মৃত্যু ঘটে। এখানে ডোপামিনের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আপনি যে ধরনের এক্টিভিটিতে যুক্ত, তার ওপর নির্ভর করে ডোপামিন নিঃসরণ হয়। যদি এই ডোপামিন আসে শর্টকাট আনন্দ থেকে, তাহলে মন আর কষ্ট করে ভাবতে চায় না। কঠিন কাজকে সে স্বাভাবিকভাবেই এড়িয়ে চলে। আর যে ব্যক্তি নিয়মিত কঠিন বিষয় এড়িয়ে চলে, তার জীবনে বড় সাফল্যও খুব কমই আসে। এটি হঠাৎ ঘটে না, ধীরে ধীরে অভ্যাসের মাধ্যমে একটি বড় সমস্যায় রূপ নেয়।
আরও একটি বাস্তব চিত্র হলো, শিক্ষার্থীর ইচ্ছে থাকে পড়ার, কিন্তু পড়া শুরু করতেই ফোন ধরার এক অদ্ভুত তাড়না কাজ করে। সে যতক্ষণ পড়ে, তার পাঁচ গুণ বেশি সময় কাটে ফোনে। ফলে যে কাজটি সে করতে চায়, সেখানে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। শেখা সীমাবদ্ধ থাকে সারফেস লেভেলে, গভীর বোঝাপড়া তৈরি হয় না। সহজ ভাষায় বললে, সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি, নিজের জীবন ও উন্নয়ন নিয়ে ভাবার সময়ও কমে যায়। সে সবসময় অন্যের জীবন দেখায় ব্যস্ত থাকে। আত্মসমালোচনা ও আত্মউন্নয়নের জায়গাটি অনুপস্থিত হয়ে পড়ে। ফলে আত্ম-উপলব্ধির দরজাটিও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা জরুরি, আমি কি কনটেন্ট ব্যবহার করছি, নাকি কনটেন্ট আমাকে ব্যবহার করছে? সমাধানের পথ নিশ্চয়ই আছে। স্ক্রল কমাতে হবে, নিরব সময় তৈরি করতে হবে। গভীর কোনো কাজে নিজেকে যুক্ত করতে হবে এবং সে অনুযায়ী চিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। এখানে উপদেশ নয়, উপলব্ধিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর অনুঘটক।
প্রতিটি স্ক্রল ও প্রতিটি স্কিপ ধীরে ধীরে একজন শিক্ষার্থীকে অগভীর করে তোলে। আর চিন্তার গভীরতা বাড়াতে হলে আত্মশক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
আরও পড়ুন
সোশ্যাল মিডিয়া নজর রাখছে আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও
সত্যিই কি ভবিষ্যতে ফোন-কম্পিউটার থাকবে না?
লেখক: শিক্ষার্থী, ভোলা সরকারি কলেজ, ভোলা
কেএসকে