সুলতানি আমলের বাবা আদম শহীদ মসজিদ
মুহিবুল হাসান রাফি
সুলতানি আমলে নির্মিত হয়েছে বাবা আদম শহীদ (রহ.) মসজিদ। এটি ঢাকার অদূরে মুন্সিগঞ্জের রামপালের দরগাবাড়িতে অবস্থিত। ১৪৮৩ সালে সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের শাসনামলে বিক্রমপুরের শাসক মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯৪৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে মসজিদটিকে অধিভুক্ত করা হয়। হজরত আদম শহীদের (রহ.) স্মৃতি সংরক্ষণের জন্যই মূলত মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন।
হজরত আদম শহীদ ছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর একজন ধর্মপ্রচারক। যিনি স্থানীয় অত্যাচারী হিন্দু রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হন। বিক্রমপুরের ইতিহাসখ্যাত রামপাল গ্রামের নিকটবর্তী কাজী কসবা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী আদম শহীদ মসজিদটি সুলতানি আমলে গড়ে উঠেছে। মসজিদটি ছয় গম্বুজের। এতে তিনটি মূল প্রবেশদ্বার আছে।
মসজিদের ভেতরে প্রবেশের আগে প্রায় ১০ হাত সামনে একটি লোহার ব্যারিকেড আছে। ব্যারিকেডটি মসজিদটিকে ঘিরে রেখেছে। ব্যারিকেডে একটি প্রবেশপথ আছে, যা মসজিদের মূল ফটকের খানিকটা সামনে বামদিকে। মসজিদটি আয়তাকার ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যার উত্তর-দক্ষিণের আয়তন ৪৩ ফুট ও পূর্ব-পশ্চিমে ৩৬ ফুট। মসজিদের চার কোণায় অষ্ট কোণাকৃতির মিনার আছে। এসব মিনার ছাদের কার্নিশের ওপর ওঠেনি।
পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার অবতল মেহবার আছে। কেন্দ্রীয় মেহরাবের পেছন দিকের দেওয়াল বাইরের দিকে উদগত। মেহরাবের ওপরের দিকটার দেওয়ালে কয়েক স্তরের নকশা খচিত আছে। সামনের দেওয়ালে ধনুকাকৃতির যেসব খিলান আছে; সেসব খিলানের উপরিভাগের আয়তাকার ফ্রমের ওপরে অতি সুন্দর কারুকার্য দৃশ্যমান। প্রধান প্রবেশদ্বারের ওপরে খাঁজকাটা কারুকাজ খচিত। দুপাশে ঝুলন্ত শেকলে ঘণ্টা অলংকৃত আছে।
আরও পড়ুন
৭০০ বছরের ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তির অনন্য নিদর্শন
ঐতিহাসিক নিদাড়িয়া মসজিদের সংস্কার জরুরি
মসজিদটির কোনো দিকেই বারান্দা নেই। ভেতরে দুটি গ্রানাইট পাথরের স্তম্ভ আছে। অভ্যন্তর এসব স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অভ্যন্তর ভাগ স্তম্ভ দুটির সাহায্যে পূর্ব-পশ্চিমে দুই সারিতে ও উত্তর-দক্ষিণে তিন সারিতে বিভক্ত। স্তম্ভ দুটি মধ্যখান থেকে চার ফুট অষ্ট কোণাকৃতির ও এরপর থেকে ষোলো কোণাকৃতির। মূল মেহরাব ও দুপাশের মেহরাবের দেওয়াল বিভিন্ন ধরনের নকশায় অলংকৃত। গোলাপফুল, লতাপাতা, জ্যামিতিক নকশা ও ঝুলন্ত প্রদীপের নকশাও আছে।
মসজিদের দেওয়াল বেশ পুরু। চতুর্দিকের দেওয়ালের ওপর ছয়টি গম্বুজ, যা মসজিদের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। মসজিদের সামনের দেওয়াল পোড়ামাটির চিত্রফলক দিয়ে বেশ সজ্জিত। মূল প্রবেশপথের দুধারে চিত্রফলকের কাজ এখনো চোখে পড়বে। মূল ফটকের ওপরে আরবি ক্যালিগ্রাফির নকশা আছে। এটি দেখতে বেশ চমকপ্রদ।
দেশের ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ সম্পর্কে জানতে চাইলে মসজিদের ইমাম মাওলানা সানাউল্লাহ বলেন, ‘মসজিদটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মসজিদ। এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। মসজিদকে ঘিরে অনেক ইতিহাস আছে। এর মধ্যে প্রসিদ্ধ ইতিহাস হলো আব্দুল কাদের জিলানীর (রহ.) একজন খলিফা এ দেশে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। বিক্রমপুরটা রাজা বল্লাল সেন চালাতেন। বল্লাল সেনের সঙ্গে গরু জবেহকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধে। মুসলমানদের মধ্য থেকে প্রধান ভূমিকা পালন করেন বাবা আদম শহীদ (রহ.)। এই যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয় লাভ করেন। তখন থেকে মসজিদে মুসলমানদের তাজকিয়া, ইলম ও দ্বীন বোঝানো হতো।’
ঢাকার অদূরে মসজিদটি মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে একটু ভেতরে রামপালের দরগাবাড়িতে অবস্থিত। বাবা আদম শহীদ (রহ.) নামের মসজিদটি মুন্সিগঞ্জে ইসলাম প্রচারের অনেক পুরোনো ইতিহাস বহন করে, যা কালের সাক্ষী। ৬ টাকার ডাকটিকিটে স্থান পাওয়া মসজিদটি মুন্সিগঞ্জ শুধু নয়, দেশের একটি ঐতিহ্য। সংস্কারের অভাবে যা নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ।
এসইউ