হিমালয়ের পাণ্ডুলিপি

বাকল থেকে ইতিহাসে বেঁচে থাকা বিস্মৃত সভ্যতা

ইকরামুল হাসান শাকিল
ইকরামুল হাসান শাকিল ইকরামুল হাসান শাকিল , পর্বতারোহী ও লেখক
প্রকাশিত: ০৫:১৯ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
ইতিহাসের এক অবিনশ্বর ধারক, ছবি: লেখকের সৌজন্যে

গহীন হিমালয়ের মেঘ-ছোঁয়া পর্বতশৃঙ্গের আড়ালে, যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছর ধরে; সেখানেই প্রকৃতির ভাঁজে লুকিয়ে আছে এক নীরব ঐতিহ্য। আজকের এই যান্ত্রিক কাগজের বিপ্লবের বহু আগে, যখন সভ্যতার অক্ষরগুলো কেবল প্রাণ পেতে শুরু করেছে; তখন হিমালয়ের অরণ্যচারী মানুষেরা গাছের ছাল-বাকল থেকে তৈরি করতো জ্ঞান সংরক্ষণের এক আশ্চর্য মাধ্যম। এই কাগজ কেবল লেখার উপকরণ ছিল না; এটি ছিল হিমালয় অঞ্চলের প্রজ্ঞা, বিশ্বাস এবং ইতিহাসের এক অবিনশ্বর ধারক।

হিমালয়ের দুর্গম জনপদে মূলত ড্যাফনি প্যাপিরাসিয়া, ভোজপত্র বা বিভিন্ন ধরনের গাছের বাকল ব্যবহার করে এই কাগজ প্রস্তুত করা হতো। এর নির্মাণশৈলী ছিল ধৈর্য ও শিল্পের এক অনন্য মেলবন্ধন। বন থেকে সংগৃহীত বাকল দীর্ঘসময় ধরে ঝরনার স্বচ্ছ জলে ভিজিয়ে রাখা হতো। এরপর পাথরের বুক চিরে বয়ে আসা প্রবল শক্তিতে পিটিয়ে তাকে করা হতো মখমলের মতো নরম। সবশেষে পাহাড়ের প্রখর রোদে শুকিয়ে তৈরি হতো একেকটি টেকসই কাগজ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আধুনিক কাগজ যেখানে সময়ের ভারে হলদে হয়ে ফেটে যায়, হিমালয়ের এই হাতে তৈরি কাগজ কয়েক শতাব্দী ধরে আর্দ্রতা ও পোকামাকড়ের আক্রমণ সয়ে আজও অক্ষত রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন
দাঁড়িয়ে আছি পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে 
বিমানবন্দরে নামবো একদম খালি হাতে: ইকরামুল হাসান শাকিল 

এই পবিত্র পাতাগুলোতেই আপন মহিমায় ফুটে উঠেছে বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় সূত্র, সনাতন ধর্মের প্রাচীন শ্লোক, রাজকীয় ফরমান এবং হিমালয়ী জনগোষ্ঠীর মুখে মুখে ফেরা অগণিত বীরগাথা। তিব্বত থেকে নেপাল কিংবা সিকিম থেকে ভুটান, অসংখ্য বৌদ্ধ মঠ ও গুম্ফার প্রাচীন সিন্দুকে আজও সংরক্ষিত আছে এমন সব পাণ্ডুলিপি, যা প্রমাণ করে হিমালয়ের মানুষ কেবল কঠোর পর্বতারোহীই ছিল না, তারা ছিল দর্শন ও জ্ঞানচর্চার এক অগ্রগামী সভ্যতা।

প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই সহাবস্থান ছিল বিস্ময়কর। কাগজ তৈরির জন্য তারা গাছ নিধন করতেন না বরং নিপুণ হাতে ছাল ছাড়িয়ে নিতেন, যাতে গাছটি পুনরায় জীবন ফিরে পায়। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের এই শিক্ষা আজকের আধুনিক বিশ্বের জন্যও এক বড় দৃষ্টান্ত।

হিমালয়ের সেই নির্জন গুহা আর গুম্ফায় বাকলের পাতায় লেখা ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো কেবল অট্টালিকায় নয় বরং প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা একনিষ্ঠ সাধকদের হাতেও তৈরি হতে পারে। সেই প্রাচীন ঐতিহ্য আজ কেবল কাগজ নয় বরং সময়ের বরফস্তর ভেদ করে টিকে থাকা এক অমর উত্তরাধিকার, যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে আজও অম্লান।

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।