যে মসজিদে নামাজ পড়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

বিধান মজুমদার
বিধান মজুমদার বিধান মজুমদার , জেলা প্রতিনিধি, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ১২:২২ পিএম, ১২ মার্চ ২০২৬
শরীয়তপুরের বুড়িরহাট ঐতিহাসিক জামে মসজিদ

দেওয়ালজুড়ে মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, নান্দনিক খিলান ও গম্বুজের মনকাড়া নকশা। যা নজর কাড়বে যে কারো। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শরীয়তপুরের বুড়িরহাট ঐতিহাসিক জামে মসজিদ এটি। মসজিদটি ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা ও স্থাপত্যশিল্পের জীবন্ত নিদর্শন। এমনকি মসজিদের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে যাত্রাপথে বহর থামিয়ে ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মসজিদটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি একাব্বর হোসেন হাওলাদার মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। শুরুতে একটি ছোট খড়ের ঘরে নামাজ আদায় করলেও পরে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্থায়ী মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ধারণা করা হয়, ১৯০৩-১৯০৭ সালের মধ্যে মূল কাঠামোর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। পরে মমতাজ উদ্দিন হাওলাদার এটি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করেন। ধাপে ধাপে সংস্কার ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১৯৩৫ সালের মধ্যে মসজিদটি পূর্ণাঙ্গ স্থাপত্যরূপ লাভ করে।

নির্মাণকাজে ইংল্যান্ড থেকে আনা সিমেন্ট এবং দিল্লির এক মসজিদের ডিজাইন ও মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল, যা সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দৃষ্টিনন্দন উপকরণ। প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মসজিদ কমপ্লেক্সটির দৈর্ঘ আনুমানিক ২৫০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১২০ ফুট। দেওয়ালের পুরুত্ব তিন ফুটেরও বেশি। মসজিদটিতে আছে একাধিক গম্বুজ এবং সুউচ্চ মিনার, যা দূর থেকে দৃষ্টিগোচর হয়।

buri

বর্তমানে একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও বুড়িরহাট মসজিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এখানে কোরআন শিক্ষা ও ধর্মীয় পাঠদান চালু আছে, যা স্থানীয় সমাজব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রমজানে মাসে প্রতিদিন থাকে ইফতারের ব্যবস্থা। এখনো দূর-দূরান্তের মানুষ আসে মসজিদটির সৌন্দর্য উপভোগ ও নামাজ আদায়ের জন্য। তবে সঠিক তদারকির অভাবে নষ্ট হচ্ছে মসজিদটির সৌন্দর্য। তাই সরকারিভাবে দেখভালের দাবি স্থানীয়দের।

তাওসিফ নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‌‘আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে মসজিদটি দেখে আসছি। তারা বলতেন, একসময় মসজিদটি একটি কুঁড়েঘর ছিল। পরে ধাপে ধাপে এলাকার মানুষ এটি পাকা একটি সুন্দর মসজিদে রূপ দেয়। এর সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে মার্বেল পাথর বসানো হয়েছে। তবে কালের বিবর্তনে এটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই মসজিদটি সরকারিভাবে দেখভাল করা হোক।’

২০১৬ সাল থেকে শরীয়তপুরে চাকরির সুবাদে থাকেন খুলনার শাহাদাত হোসেন। প্রথম দেখাতেই মসজিদের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তারপর থেকেই প্রতি জুমায় নামাজ পড়তে আসেন এ মসজিদে। তিনি বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে শরীয়তপুরে চাকরির সুবাদে আছি। প্রথম যেদিন মসজিদের সৌন্দর্য দেখেছিলাম, আমার দারুণ লেগেছিল। আমি মাঝেমধ্যেই এদিক দিয়ে যাওয়ার পথে নামাজ পড়ি। প্রতি জুমাবার নামাজ পড়তে আসি। এখানে এলে একটা শান্তি কাজ করে।’

buri

মোহাম্মদ রকি নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে বিভিন্ন জেলার মানুষ ঘুরতে আসেন। তারা মসজিদের সৌন্দর্য দেখে প্রশংসা করেন। আমাদের স্থানীয়রা মিলে প্রতি রমজানে প্রতিদিন ইফতারের ব্যবস্থা রাখে। যারাই এপথে যান; তারা এখান থেকে ইফতার করেন। তবে আমরা চাই মসজিদটি আরও সম্প্রসারণ করে উন্নয়নমূলক কাজ করা হোক। সরকার যেন তাতে সাহায্য করে।’

বুড়িরহাট ঐতিহাসিক জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা সাব্বির আহম্মদ ওসমানী বলেন, ‘প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন মসজিদটিতে নামাজ আদায় করতে আসেন। এমনকি এখানে আল্লাহর মাখলুকরা নামাজ পরেন তা অনুভব করতে পারি। এখানে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। সব মিলিয়ে এটি এ অঞ্চলের একটি সৌন্দর্যমণ্ডিত মসজিদ।’

buri

মসজিদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রফেসর মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছে মসজিদটি। দিল্লির এক মসজিদের অনুকরণে এটি নির্মাণ করা হয়। মসজিদের সৌন্দর্য দেখে যাত্রাপথে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ২ রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছিলেন। মানুষের সাহায্য নিয়েই মসজিদটি চলছে। মসজিদটিতে উন্নয়ন কাজ চলছে এবং সংস্কারের প্রয়োজন আছে। আমরা চাই সরকার এ ব্যাপারে সহযোগিতা করুক। তাহলে আরও সুন্দর করে এর উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।