অস্ট্রেলিয়ায় জোসনা বিহার

ভ্রমণ ডেস্ক
ভ্রমণ ডেস্ক ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০২০

মো. ইয়াকুব আলী

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে জোসনার আসল সৌন্দর্য টের পাওয়া যায় না। কারণ চারিদিকেই অনেক রকমের আলো। আমার মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে পূর্ণিমার রাতগুলোয় পুরো শহরে ব্ল্যাকআউট হোক। মানুষ অবাক হয়ে দেখুক, তাদের আশেপাশে প্রকৃতি কত উপাদান ছড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব নয়। তাই মনে মনে পরিকল্পনা করছিলাম, কোনো এক পূর্ণিমা রাতে বনে চলে যাবো পূর্ণিমার আসল সৌন্দর্য দেখার জন্য। কিন্তু সঙ্গী পাচ্ছিলাম না।

হঠাৎ একদিন সুযোগটা এসে গেলো। আশফাক ভাই, দিশা ভাবী, তাদের মেয়ে আলিশা এবং ছেলে দৃপ্ত। আমরা বলি, সিডনিতে আমাদের আপন বড় ভাই, ভাবি, ভাইঝি এবং ভাইস্তার অভাব পূরণ করেছে। আমাদের বর্তমান বাসাও তাদের খুব কাছে। তাই মাঝেমধ্যেই রাতে হাঁটতে হাঁটতে তাদের বাসায় চলে যাই। তারপর সবাই মিলে হাঁটতে বের হই।

দিশা ভাবির জন্মদিন উপলক্ষে আশফাক ভাই একটা ছোটখাটো সারপ্রাইজ পার্টি দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। তার সাথে যোগ দিলাম আমাদের পরিবারের চারজন। সিডনিতে আমাদের স্থানীয় অভিভাবক নাজমুল ভাই, সন্ধ্যা ভাবি, তাদের ছেলে সজীব, ছেলের বউ ফাহিমা, দুই নাতনি জেইনা এবং জাহিয়া।

jagonews24

নির্দিষ্ট দিনে সবাই অফিস শেষ করে নাজমুল ভাইদের বাসায় হাজির হলাম। জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হঠাৎ প্রস্তাব করলাম, ‘আজ যেহেতু পূর্ণিমা রাত, চলেন সবাই মিলে জোসনা বিহারে যাই।’ অন্যদিন কেউই রাজি হন না। কিন্তু সেদিন দিশা ভাবি রাজি হয়ে গেলেন। সাথে আমি আর ফাহিমাও সুর মেলালাম। জায়গাটা আমি মনে মনে আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। আমাদের বাসা থেকে মাত্র মিনিট দশেকের ড্রাইভ, নাম কেইথ লংহার্স্ট রিজার্ভ।

আমাদের বাসা সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমের সাবার্ব মিন্টোতে। এগুলো একসময় মফস্বল এলাকা ছিল। দিনে দিনে শহরের হাওয়া লাগছে। আমাদের বাসার আশেপাশেই এখনও অনেক ফার্ম হাউস আছে, আছে সবজির ক্ষেত, আরও আছে নদী এবং বন। কেইথ লংহার্স্ট রিজার্ভ আসলে একটা বন। সিডনির জর্জেস রিভারের দুপাশেই রয়েছে ঘন বন। সেটারই নাম এলাকা অনুযায়ী শুধু পরিবর্তন হয়েছে। বাইরে এসে আমরা বুঝলাম, জোসনা বিহারে যাওয়ার জন্য আবহাওয়াটা দুর্দান্ত। পঞ্জিকা অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় এখন বসন্তকাল। তাই বাইরে নাতিশীতোষ্ণ বাতাস। আমরা তিন পরিবার বেরিয়ে পড়লাম জোসনা বিহারে।

jagonews24

বনের মধ্যে আঁকা-বাঁকা উঁচু-নিচু রাস্তা পেরিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে রাস্তাটা শেষ হয়ে গেছে। সেখানে গাড়ি পার্ক করে আমরা বনের মধ্যে এগিয়ে চললাম। কিঞ্চিৎ ভয় পাচ্ছিলাম, এ রাতের বেলা বাচ্চাগুলোকে কিভাবে ম্যানেজ করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো চাঁদের আলোয় ওরাই সবার আগে গিয়ে আমাদের পথ দেখাচ্ছে। এভাবে আলিশা, দৃপ্ত, জেইনা ও তাহিয়া আমাদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল।

জাহিয়া ওর বাবার কোলে আর রায়ান ঘুমিয়ে পড়াতে আমার গিন্নি গাড়িতেই রয়ে গেলেন। জায়গাটি রায়ানের খুবই পছন্দ। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ায় ওকে আনা হলো না। বনের মধ্যে চাঁদের আলোয় সবকিছু খুবই পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল। মাটির পায়ে হাঁটা পথ, মাঝেমধ্যে ছোট ছোট পাথর ছড়ানো। গাছের পাতার ফাঁক গলে চাঁদের আলো এসে পড়ছে। তাতেই তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত সব আল্পনা। চারিদিকে পরিচিত বন। কিন্তু চাঁদের আলোয় সব কেমন অপরিচিত এবং রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আমরা এগিয়ে চললাম।

jagonews24

রাস্তাটি বেশ কয়েক জায়গায় পাথরের মাঝ দিয়ে সামান্য নিচে নেমে গেছে। সেখানে দু’পাশে পাথর দাঁড়িয়ে আছে অনেকটা রাতজাগা প্রহরীর বেশে। বাচ্চারা হৈ হৈ করে পাথরে উঠে তাদের কৃতিত্ব দেখাচ্ছিল। প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর রাস্তাটা হঠাৎ নিচে নেমে গেছে। নিচেই জর্জেস রিভারের পানির প্রবাহ। পানির প্রবাহটা ঠিক এ জায়গাটায় এসে সামান্য নিচে পরে একটা ঝরনা তৈরি করেছে। যার পানি পড়ার শব্দ উপর থেকেও পাওয়া যায়।

আমরা দলবেঁধে নামা শুরু করলাম। আশফাক ভাই আর দিশা ভাবি একটু আগেই থেমে গিয়েছিলেন। নিচে নামার ঠিক আগেই সজীব এবং জাহিয়া থেকে গেল। কারণ জাহিয়াকে কোলে নিয়ে এ খাড়া সিঁড়ি ওঠা-নামা করা যথেষ্ট পরিশ্রম সাধ্য কাজ হবে। আমরাও কিছুদূর নামার পর আর ঝুঁকি নিলাম না। কারণ বয়স্ক মানুষ বলতে শুধু আমি আর ফাহিমা। কিন্তু বাচ্চা সর্বমোট চারটা। আমরা যখন ফিরছি; তখন দৃপ্ত বলল, ‘চাচ্চু আমরা দিনের বেলায় এখানে আসবো, কেমন?’ আমি বললাম, ‘অবশ্যই।’

jagonews24

প্রতি পূর্ণিমা রাতেই আমার একজন মানুষের কথা খুব করে মনে পড়ে। তিনি হলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। যার হাত ধরে আমরা জোসনা বিলাস, জোসনা বিহারের মতো বিষয়গুলো উদযাপন করতে শিখেছি। এবার বনে জোসনা বিহারের পর মনে মনে পরিকল্পনা করে রেখেছি, কোনো এক পূর্ণিমা রাতে আবারও দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়বো। এবারের গন্তব্য হবে সমুদ্র।

জীবনে আসলে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দই আমাদের সুখী করে। পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার নামই জীবন নয়। বরং প্রকৃতির রূপ-রস-সুধা যতটা পারা যায় উপভোগ করার মধ্যে জীবনের আসল সার্থকতা। এগুলো উপভোগ করতে শিখে গেলে যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি আর কখনো আপনাকে পেয়ে বসবে না। পাশাপাশি আপনার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি বারবার মনে ফিরে এসে মনকে রাখবে সতেজ-সজীব। জীবনটাকে মনে হবে অর্থবহ। বারবার এ পৃথিবীতে জন্ম নিতে ইচ্ছে করবে।

লেখক: অস্ট্রেলিয়ার সিডনি প্রবাসী।

এসইউ/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]