পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা কক্সবাজার থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ১১:২৫ এএম, ০৪ নভেম্বর ২০২১

‘মা, উড়োজাহাজটা কি সাগরের পানিতে ডুবে যাবে নাকি? সূর্য কীভাবে সমুদ্রের পানিতে ডুবছে?’ বিশ্বের সর্ববৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের কলাতলী বিচে দাঁড়িয়ে সূর্য ডোবার অপরূপ দৃশ্য দেখার ফাঁকে একটি উড়োজাহাজকে মাঝসমুদ্রে খুব কম উচ্চতায় উড়াল দিতে দেখে আট বছরের ছোট্ট শিশু আঁখি পাশে দাঁড়ানো মায়ের উদ্দেশে এমন প্রশ্ন ছোড়ে। তখনো সাগরতীরে সন্ধ্যা নামেনি, মেয়ের প্রশ্নে কান না দিয়ে মায়ের চোখ ছিল কেবলই ক্রমশ তলায়মান সূর্যটার দিকে।

রাজধানীর মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম দম্পতি তখন বিচে দাঁড়িয়ে সিঁদুররঙা সূর্যাস্ত দেখতেই বুঁদ। মেয়ে কী জানতে চাইছে, কী প্রশ্ন করছে, সেসবের দিকে তাদের কোনো খেয়ালই ছিল না। এ দম্পতির নিষ্পলক চোখ তখনো মুগ্ধতা নিয়ে আদিগন্ত নীল জলরাশির ওপর হেলে পড়া লাল টকটকে সূর্যটার ওপর। দুচোখে সাগরজলে সূর্য ডোবার দৃশ্য শিকারের ফাঁকে মেয়েকে কাছে টেনে শুধু এটুকু বললেন, পরে তার সব প্রশ্নের উত্তর দেবেন। গত সোমবার (১ নভেম্বর) বিকেলে কক্সবাজার সাগর সৈকতের কলাতলী বিচে ছোট্ট এ পরিবারটির সূর্যাস্ত দর্শনের এমনই চিত্র চোখে পড়ে।

পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

সেখানে আলাপকালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, মহামারি করোনার কারণে পরিবারের সবাই ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিল। সংক্রমণ কিছুটা কমে আসায় এবং কক্সবাজার ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ওঠায় পরিবার নিয়ে তিনি ঘুরতে এসেছেন। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় কক্সবাজারের সামগ্রিক পরিবেশ এখন অনেক ভালো মনে হচ্ছে তার কাছে।

পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

শুধু সিরাজুল ইসলাম নন, করোনার প্রাদুর্ভাব শিথিল হওয়ায় এমন বহু মানুষ স্ত্রী-সন্তান বা আত্মীয়-স্বজন নিয়ে সাগরতীরে ছুটে আসছেন একটু মুক্ত হাওয়া গায়ে মাখতে। তারাও বলছেন, এখানকার রাস্তাঘাটের আধুনিকায়নসহ সমুদ্রসৈকত এলাকার পরিবেশ আগের তুলনায় এখন অনেক ভালো। যত্রতত্র ময়লা নেই। বিচে সারি সারি করে রাখা বিশ্রামের চেয়ার, ছবি তোলা, মোটরবাইকের ভাড়া জেলা প্রশাসন নির্ধারণ করে দেওয়ায় পর্যটকদের সঙ্গে নেই বাদানুবাদ। ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতায় সৈকতে গভীর রাত পর্যন্ত পর্যটকেরা নিরাপদে ঘুরতে পারেন।

পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

গত ১ ও ২ নভেম্বর সরেজমিনে কক্সবাজার ঘুরে দেখা গেছে, মহামারি করোনাকালের ভীতি কাটিয়ে ক্রমেই পর্যটকমুখর হচ্ছে কক্সবাজার। ছোটবড় বিভিন্ন হোটেলে কমবেশি পর্যটকের ভিড় চোখে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা পরিবার-পরিজন বা বন্ধুরা মিলে ঘুরতে আসছেন। কেউ উড়োজাহাজে, কেউ বাসে, আবার কেউবা ব্যক্তিগত গাড়ি করে আসছেন। সকাল-সন্ধ্যা সাগরের পানিতে দাপাদাপি করছেন অনেকে। কেউ মোটরবাইক ভাড়া করে সমুদ্রে চক্কর মারছেন, আবার কেউবা তীরের হিমেল হাওয়ায় প্রিয়জনের হাত ধরে ক্লান্তিহীন পায়ে মৃদু ছন্দে হাঁটছেন অনেকটা পথ ধরে।

পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

সমুদ্রসৈকত ছাড়াও পর্যটকদের অনেকে উঁচু সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠছেন হিমছড়ি পাহাড়ে। ছোট ছোট কুটিরে পাশাপাশি বসে একইসঙ্গে সুনীল আকাশ, তারই তলে সাগরের নীল জল আর সবুজ ঘেরা পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য সুধা পান করছেন। কেউ কেউ ইনানী বিচ, রয়েল টিউলিপ বিচ বা পাতুয়ার টেক (পাথরের টেক) স্পটে ঘুরছেন।

পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, করোনার কারণে বিদেশের অনেক দেশে এখনো ভ্রমণ ভিসা চালু না হওয়ায় পর্যটকেরা কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্পটে ভ্রমণ করছেন। কক্সবাজারে আকাশপথে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এবং নভোএয়ারের ফ্লাইটে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার পর্যটক আসছেন। সড়কপথে হাজারো পর্যটকের যাতায়াত।

পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

স্থানীয় ছোট-বড় হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কমায় এবং শীত শুরু আগ মুহূর্তে পর্যটকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। শীত মৌসুমে এ চাপ আরও বাড়বে প্রত্যাশা তাদের।

পর্যটনবান্ধব কক্সবাজার ফিরছে স্বরূপে

তবে পর্যটকদের অনেকেই বলছেন, অন্য সব ব্যবস্থাপনা ভালো হলেও সি ভিউ এলাকায় খাবার ও যানবাহনের অতিরিক্ত দাম হাঁকানো হচ্ছে। এ বিষয়গুলোতে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ তাদের।

এমইউ/এমকেআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।