কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

আসিফ আজিজ
আসিফ আজিজ আসিফ আজিজ , অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত ঘুরে
প্রকাশিত: ০১:৪১ পিএম, ০৮ নভেম্বর ২০২১

শরৎ তো প্রকৃতি থেকে এবার উধাও বলা চলে। শেষ কার্তিকেও দেখা নেই শীতের। মাথার ওপর টনটনে সূর্য। গা পুড়িয়ে দিতে তাই মায়াদয়া নেই! চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিংক রোড ধরে গন্তব্য সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সৈকত। শহুরে হাওয়ায় পাহাড়ের সবুজ বুক চিরে মসৃণ এ সড়ক মুগ্ধ করলো যাত্রার শুরুতেই। ঠিক সেই থাইল্যান্ডের ক্র্যাবির মতো। দুপাশে পাহাড়। পার্থক্য শুধু আমাদের দেশের পাহাড় মাটির। তাই সবুজে ঠাসা। এটাই যেন প্রাণ।

চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড ৩১ কিলোমিটার। এটাই ঢাকা রোড। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে আরও পাঁচ কিলোমিটার এগোলে গুলিয়াখালী। রাস্তাটি সর্পিল। চলে গেছে গ্রামের বুক চিরে। ঠেকেছে বঙ্গোপসাগরের কিনারে গিয়ে। খাঁটি গ্রামের গন্ধ মন ভরাবে এই পথ। তবে মানুষগুলো ঠিক সুবিধার ঠেকলো না। গন্তব্য চিনতে দু-দুবার বিভ্রান্ত করলো দুজন। খালঘাটে গিয়েও অভিজ্ঞতা সুখের হয়নি। তবে গ্রামটির প্রাকৃতিক অভ্যর্থনায় মুগ্ধ। লকলকে শিমডগা মাচার ওপর গলাগলি করে জড়িয়ে। একপাশে ঝুলছে কচি লাউ। পটলের সিজন শেষ হলেও মাচায় এখনো ঝুলছে কিছু কিছু। শীতের সবজিও আড়ষ্টতা ভেঙে হাসছে সূর্যহাসি।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম—যেদিক দিয়েই যেতে চান সীতাকুণ্ড বাজারে নেমে এ সড়ক ধরেই এগোতে হবে। রাস্তা শেষ হয়েছে গুলিয়াখালী খালের ঘাটে গিয়ে। এলাকাটি মুরাদপুর নামেও পরিচিত। তাই মুরাদপুর বিচও বলে। আমাদের বাহন ছিল মাইক্রোবাস। বড় বাসে এখানে আসা সম্ভব নয়। সংখ্যায় কম হলে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চলতে সমস্যা নেই। গুলিয়াখালী স্ট্যান্ড থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাকালে দেখা যাবে ঢালের মতো দাঁড়িয়ে সীতাকুণ্ডের পাহাড়শ্রেণি।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

তখন বাজে বেলা সাড়ে ১১টা। সাগরে ভাটা। ভেড়িতে দাঁড়িয়ে হাঁটা দূরত্বে দেখা গেলো কেওড়াবন। সাগর থেকে একটি ছোট্ট শাখা এসেছে পশ্চিম দিকে। সেখানে বাঁধা বেশ কয়েকটি ফাইবার বোট। হাঁটা দূরত্ব হলেও হাঁটার অবস্থা নেই। প্যাঁচপেঁচে কাদা। সৈকত পর্যন্ত যেতে হলে তাই চড়তে হবে বোটে। সৈকত উত্তর-পূর্ব প্রান্তে। আমরা পাঁচজন ওঠার পর বোটের লোকসংখ্যা দাঁড়ালো ২২ জনে। কিন্তু চালক আরও নয়জন না নিয়ে ছাড়বে না। আমাদের আগে থেকে অপেক্ষা করা নয় জনের একটি গ্রুপ তাই রাগ করে নেমেই গেলো। তবু বিকার নেই চালকের। তাদের কোনোভাবেই থামানো গেলো না। এতটাই বিরক্ত যে বিচ না দেখে তারা চলেই গেলো। পরিবহন ধর্মঘট হওয়ায় শুক্রবার হলেও লোক তুলনামূলক কম ছিল। তাছাড়া বিকেলে জমে বেশি। অবস্থা বুঝে এগিয়ে এলেন পরবর্তী সিরিয়ালের বোটম্যান। আমরা উঠলাম সেটাতে। পর্যটকদের সঙ্গে এহেন আচরণের জন্য পেনাল্টি হিসেবে তার সিরিয়াল তিন বোটের পরে দিলো ম্যানেজমেন্ট। যাতায়াত ৬০ টাকা ভাড়ায় ১২ জন নিয়ে খাল দিয়ে যাত্রা করলো বোট।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

যারা সুন্দরবন দেখেছেন তাদের কাছে শ্বাসমূল, কেওড়া গাছ নতুন মনে না হলেও যাত্রাপথটি খারাপ লাগবে না। ছোটখাটো ম্যানগ্রোভ বন। খালের পাড়ে বসে আয়েশে আমাদের অভ্যর্থনা জানালো সাদা বকেরা। বোটের মোটরের শব্দ তাদের আয়েশে কোনো ব্যাঘাত ঘটালো না। বোঝা গেলো তারা এতে অভ্যস্ত। মিনিট ১৫ পর বোট গিয়ে থামলো গুলিয়াখালী সৈকতে। গত পাঁচ-ছয় বছরে অনেক ছবিতে দেখা সেই সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী। বিস্তীর্ণ সবুজ চাঁদোয়ার বুকে যেন শ্বাসমূল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে কেওড়াবন। সবুজগুলোর মাঝে আবার বিভিন্ন আকৃতির খানাখন্দ। প্রাকৃতিকভাবেই এই গঠন। আর এটাই যেন সৌন্দর্য বাড়িয়েছে কয়েক গুণ।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

সৈকতে পা রাখামাত্রই আমাদের স্বাগত জানালো লাল কাঁকড়ার দল। ছোট ছোট মাটির ছিদ্রে বাসা তাদের। একটু পায়ের শব্দ পেলেই লুকিয়ে পড়ে। আবার একটু দূরে সরতেই ভো দৌড় দিয়ে চোখ উঁচিয়ে আসে বেরিয়ে। ইঁদুর বেড়াল খেলার মতো। তাই ছবি তোলা দুরূহ। আমরা সৈকতে পা রাখতেই জোয়ার শুরু হলো। একটু একটু করে ঢেউ এসে ডুবতে লাগলো কেওড়ার শ্বাসমূল ও খানাখন্দের মতো সেই গর্তগুলো। এখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সন্দ্বীপ। মাত্র দেড় ঘণ্টায় ৩০০ টাকায় যাওয়া যায় সেখানে। তবে বোটে থাকা লাগবে পর্যাপ্ত যাত্রী। এখানকার ঘাটে আছে ১৪টি বোট।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

এই সৈকতের বিস্ময় হলো সবুজ। সৈকত মানেই আমাদের মনে যে বালিয়াড়ি ভেসে ওঠে এখানে সেটি কিন্তু ব্যতিক্রম। এখানে কোনো বালিয়াড়ি দেখা যায় না। এই সবুজ ঘাসই এখানকার সৈকত। লবণ পানিতেই দিব্যি টিকে আছে ঘাস। শিকড় বেশ লম্বা লম্বা। আশপাশের গবাদিপশুর চারণভূমিও এটি।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

এই মিনি ম্যানগ্রোভ বনের প্রধান গাছ কেওড়া। এটি সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান গাছ। এই গাছে বরইয়ের মতো আকারের এক ধরনের ফল হয় টক স্বাদের। হরিণের অন্যতম পছন্দের খাবার। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে কেওড়ার খাটা খুব জনপ্রিয়। আচারও তৈরি হয় এ থেকে। গাছেরও প্রয়োজন হয় শ্বাস-প্রশ্বাসের। কিন্তু লবণাক্ত মাটিতে গাছের শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। এসব গাছের শিকড় মাটির নিচ থেকে উপরে খাঁড়াভাবে উঠে আসে। আর সেই মূলের ডগায় থাকে ছোট ছোট ছিদ্র। এসব ছিদ্র দিয়ে বাতাস ভেতরে টেনে শ্বাস নেয় লবণাক্ত মাটির গাছ। এদের বলে শ্বাসমূল। এই শ্বাসমূলের কারণেই সুন্দরবনে হাঁটা কষ্টকর। গুলিয়াখালী এলে সাগরের পাশাপাশি অনেকে পাবেন সুন্দরবনের আবহাওয়া। জোয়ার এলে এসব গাছ-গাছড়ার অনেকাংশ তলিয়ে যায় পানির নিচে।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

সমুদ্রসৈকত তো কক্সবাজারে আছে, পতেঙ্গা গেলেও দেখা যায়। তাহলে গুলিয়াখালী কেন কষ্ট করে যাবেন। এটা একটি কমন প্রশ্ন সবার। এই ‘কেন’র উত্তর পেতে গেলে যেতে হবে পেখম ছড়িয়ে বসা সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে। সৈকতের চোখ ধাঁধানো সবুজ গালিচা গতানুগতিক সমুদ্রসৈকত থেকে আলাদা করেছে গুলিয়াখালীকে। বোট থেকে নামার সময় আমাদের সময় দেওয়া হয় এক ঘণ্টা। কিন্তু চোখের নিমিষে যেন সময় পেরিয়ে গেলো। বোটচালক কয়েকদফা এসে তাগাদা দিয়ে গেলেন। এই ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পর্যটকে ভরে গেলো।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

এক তরুণকে দেখা গেলো পায়ে কাদা মেখে থ্রি কোয়ার্টার পরে মুখের ওপর গামছা মুড়ি দিয়ে সবুজ গালিচায় শুয়ে থাকতে। একটু দূরে তার বন্ধু শাওন ডেকে ডেকে তাকে তুলতে পারছেন না। এক পর্যায়ে কাছে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে তুললেন। শাওন তখন বলছিলেন, ‘এত শান্তি জীবনে কোথাও পাইনি’। পরে কথা হলে জানালেন, ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ডের কয়েকটি স্পট দেখতে বন্ধুরা মিলে বেরিয়েছেন। সৈকতে এসেছেন হেঁটে কাদা মাড়িয়ে। ঘুমিয়ে থাকা সেই বন্ধু উঠে বললেন, ‘চলো এবার সবাই মিলে চিল করি!’

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

আমরাও ইচ্ছেমতো প্রকৃতি উপভোগ করলাম। তবে সবুজ গালিচার মধ্যে বিভিন্ন আকৃতির যে গর্ত আছে সেগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা আবশ্যক। একটু অসাবধান হলেই পা পিছলে সোজা ঢুকে যাবেন গর্তে। সঙ্গে শিশু থাকলে সবাধানতা বেশি জরুরি। এরই মধ্যে ঘিরে ধরলো ফটোগ্রাফাররা। তারা ডিএসএলআর দিয়ে ছবি তুলে দিতে চান। প্রতি ছবি পাঁচ টাকা। কোনো ছবি পছন্দ না হলে নিতে হবে না। আর ছবি সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে। মোবাইলে নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। অনেককে দেখা গেলো বিভিন্ন পোজে ছবি তুলতে। পর্যটনদের কেন্দ্র করে এখানে বেশ কয়েকটি খাবার ও বার্মিজ পণ্যের দোকানও বসেছে। চাইলে টুকটাক জিনিস কিনে নেওয়া যাবে।

কেওড়াবনের সবুজ সৈকত গুলিয়াখালী

প্রকৃতির মায়া ছেড়ে এবার ফিরতি বোটে ওঠা। চালক ঘাটের দিকে না ফিরে সমুদ্রপানে চলতে লাগলেন। নিয়ে গেলেন বেশ খানিকটা দূর। খালের পাড়ের বড় বড় গাছগুলোর তখন গলা সমান পানি। ভরা জোয়ার। খাল ভরে নদীর মতো রূপ ধারণ করেছে। এই বাড়তি ভ্রমণটা আনন্দটা বাড়িয়ে দিলো কয়েকগুণ। সত্যি মুগ্ধ হওয়ার মতো। আনন্দ ছিল সারি ধরে বসে থাকা বকগুলোর মধ্যে। ওড়াউড়ি আর আয়েশি ভঙ্গিতে এবার বিদায় জানালো তারা। সংখ্যায় এখন আরও বেশি। ১৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ঘাটে। চালক কোনো জোরাজুরি না করে ১০ টাকা করে বেশি দাবি করলেন। তিনি শেষে সৌন্দর্যের যে নতুন ভুবন দেখালেন তাতে খুশি মনে দিয়ে দিলো সবাই। নাম তার মো. রিপন। ব্যবহারে মন জিতেছেন সবার। সেই প্রথম চালকের ঠিক বিপরীত। শেষে নাম গুলিয়াখালী কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় খানেরা নাকি এই অঞ্চলে ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভয়ভীতি দেখিয়েছিলেন। সেখান থেকে নাম হয়েছে গুলিয়াখালী। তার এ ব্যাখ্যার সত্য-মিথ্যা অবশ্য যাচাই করার কোনো সুযোগ ছিল না চলতি পথে।

এএ/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]