পাটের প্রযুক্তি হতে পারে প্লাস্টিক দূষণ রোধের বিকল্প

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২৪ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২

আতিয়া আফরিন

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে মানব সভ্যতার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। শিল্প বিপ্লব ও সবুজ বিপ্লব প্রকৃতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। দুটি বিপ্লবই পৃথিবীর পরিবেশ ও প্রতিবেশকে বিপন্ন করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের জন্য দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই পরিবেশ দূষণের জন্য বর্তমানে আলোচিত বিষয় হলো প্লাস্টিকের ব্যবহার।

প্লাস্টিক
প্লাস্টিক হলো সিনথেটিক বা সেমি-সিনথেটিক ও নিম্ন গলনাঙ্কবিশিষ্ট পলিমার, যা অপরিশোধিত তেল থেকে রাসায়নিক উপায়ে তৈরি করা হয়। এটি তাপীয় অবস্থায় যে কোনো আকার ধারণ করতে পারে এবং পুনরায় কঠিনে রূপান্তরিত হতে পারে। প্লাস্টিক পলিথিন এবং ইথিলিনসহ একাধিক জৈব পলিমার দিয়ে গঠিত। ইথিলিন একটি সাধারণ অণু যা দুটি ডাবল-বন্ডেড কার্বন পরমাণু এবং চারটি হাইড্রোজেন পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত। অপরিশোধিত তেলকে সঠিক তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে ইথিলিন গ্যাস নির্গত হয়। এই ইথিলিন অণু রাসায়নিকভাবে বন্ধনযুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত পলিথিন নামক একটি চেইন বা পলিমার গঠন করে। আর প্লাস্টিক বোতলগুলোর কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে পলিথিন টেরেফথ্যালেট এবং উচ্চ ঘনত্ব পলিথিন। আলেকজান্ডার পার্কস ১৮৫৫ সালে প্রথম মানবসৃষ্ট প্লাস্টিক আবিষ্কার করেন এবং এর নাম দেন পার্কেসিন। এটি তৈরি করা হয়েছিল উদ্ভিদের সেলুলোজ ও নাইট্রিক অ্যাসিডের মধ্যে বিক্রিয়া করে। তবে ১৯০৭ সালে লিও বেকল্যান্ড সম্পূর্ণ সিনথেটিক প্লাস্টিক আবিষ্কার করেন এবং এর নাম দেন বেকেলাইট।

প্লাস্টিক দূষণ ও ক্ষতিকর প্রভাব
পরিবেশে পচনরোধী প্লাস্টিকজাতীয় দ্রব্য, উপজাত, কণিকা বা প্লাস্টিকের দ্রব্য নিঃসরিত অণুর সংযোজন; যা মাটি, পানি, বায়ুমণ্ডল, বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও মানবস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে, তাকে সাধারণভাবে প্লাস্টিক দূষণ বলা হয়। প্লাস্টিক যেহেতু পচনশীল নয়, তাই ব্যবহার করার পর ফেলে দিলে এটি পরিবেশে থাকে যুগের পর যুগ। বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১০ লাখেরও বেশি এবং বছরে প্রায় ৫ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এর মাত্র ১ শতাংশ পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং সমুদ্রে ফেলা হয় ১০ শতাংশ। প্লাস্টিক দূষণ বিশ্বজুড়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি দ্রুত কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ আমাদের সাগরে মাছের তুলনায় প্লাস্টিকের সংখ্যা বেশি হবে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৭ বিলিয়ন মানুষের ব্যবহার করা প্লাস্টিকের অধিকাংশেরই শেষ গন্তব্য হলো সমুদ্র। ২০১০ সালে সিটল সমুদ্রসৈকতে এক বিশাল মৃত তিমির পাকস্থলীতে বহু প্লাস্টিক পদার্থ জমা হয়েছিল। ২০১৯ সালে প্লাস্টিক ব্যাগ মুখে আটকে সামুদ্রিক কচ্ছপের মৃত্যু, একটি সিলের মৃত্যু হয় ৩৫ কেজি প্লাস্টিক পদার্থের সঙ্গে আটকে গিয়ে। শুধু তাই নয়, প্লাস্টিকদ্রব্য তাদের প্রজননেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যা মানব সমাজের জন্য খুবই হতাশাজনক।

প্লাস্টিক বিভিন্ন উপায়ে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে, যেমন পানির মাধ্যমে, মাছের মতো খাবার খাওয়ার ফলে বা প্লাস্টিক পণ্যগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে। প্লাস্টিক গ্রহণের ফলে মানবদেহে আলসার, জন্মগত ত্রুটি, জেনেটিক পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস, চর্মরোগ, বধিরতা, দৃষ্টি ব্যর্থতা, অচল ও লিভার সমস্যা এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। পিভিসি প্লাস্টিক পদার্থ (গৃহসজ্জার সামগ্রী, শিশুদের সুইমিংপুল, টাইলস, খেলনা, পানির পাইপ ইত্যাদি) দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে ক্যানসার, জন্মগত ত্রুটি, জেনেটিক পরিবর্তন ইত্যাদি হতে পারে। ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক থেকে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে, যা ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠীয় পানির সঙ্গে মিশে যায় এবং এভাবেই পানি গ্রহণে তা খাদ্যচক্রে ঢোকার মাধ্যমেও প্রতিনিয়ত মানবদেহে ক্ষতি সাধন করছে।

বাংলাদেশেও প্লাস্টিকের দূষণ চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নগর অঞ্চলে মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ২০০৫ সালে ছিল ৩ কেজি, ২০২০ সালে তা ৯ কেজি হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোয় গড় মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের হার অনেক বেশি। আর করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে সুরক্ষা পণ্যের ব্যবহারের ফলে প্লাস্টিক দূষণ আরও বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হলেও বাংলাদেশে এর কার্যক্রম একেবারেই সীমিত। বাংলাদেশে ১৯৮২ সাল থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পলিথিনের উৎপাদন শুরু হয়। ২০০২ সালে দেশে আইন করে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। দামে সস্তা ও অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় নানা সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ প্রধান শহরগুলোয় যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে; তার প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার। কেননা শহরের নর্দমা ও বর্জ্য নির্গমনের পথগুলো পলিথিন দ্বারা পূর্ণ। পলিথিনের কারণে পানি আটকে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

পাট
পাটের আঁশ প্রাকৃতিক জটিল পলিমারের সমন্বয়ে গঠিত। যাতে প্রধানত সেলুলোজ প্রায় ৭০ ভাগ, হেমিসেলুলোজ প্রায় ২০ ভাগ এবং লিগনিন প্রায় ১০ ভাগ রয়েছে। এ ছাড়া স্বল্প পরিমাণে ফ্যাট, মোম, নাইট্টোজেনাস ম্যাটার, বিটাক্যারোটিন ও জ্যানথোফেলাস থাকায় পাটপণ্য পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব।

২০১৭ সালে পাট ও পাটজাত সেলুলোজ থেকে পরিবেশবান্ধব সোনালি ব্যাগ উদ্ভাবন করেছে পরমাণু শক্তি কমিশনের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ড. মুবারক আহমদ খান। পলিথিনের বিকল্প পচনশীল সোনালি ব্যাগ দেখতে প্রচলিত পলিথিনের মতোই হালকা, পাতলা ও টেকসই। সম্পূর্ণরূপে পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব এ ব্যাগ পানিতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে গলতে শুরু করে, ক্ষতিকর কোনো কেমিক্যাল এতে ব্যবহার না করায় পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যেই মাটিতে মিশে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না, সৃষ্টি করবে না জলাবদ্ধতা। প্যাকেজিং মেটেরিয়াল যেমন তৈরি পোশাকের মোড়ক হিসেবে এবং খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণেও এ ব্যাগ ব্যবহার করা যায়।

সোনালি ব্যাগ প্রস্তুতি
পাটের আঁশ থেকে সূক্ষ্ম সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ আহরণ করে পানিতে দ্রবনীয় সেলুলোজে পরিণত করা হয়। এর সাথে বাইন্ডার হিসেবে প্রাকৃতিক পলিমার, ক্রসলিংকার (রং) একত্রে মিশিয়ে রিঅ্যাকশন ট্যাংকে দেওয়া হয়। ট্যাংকে তাপমাত্রা, চাপ ও সময় নিয়ন্ত্রণ করে সল্যুশন তৈরি করা হয়। মিক্স সল্যুশন রুম তাপমাত্রায় নিয়ে এসে ড্রায়ার মেশিনে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ড্রায়ার মেশিন থেকে পাতলা ফিল্ম বা শিট বের হয়ে আসে। পরে শিট কেটে চাহিদামতো পলিব্যাগের আকার দেওয়া হয়। এক কেজি পাট দিয়ে এক কেজি পলিথিন উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদিত ব্যাগে ৫০ শতাংশের বেশি সেলুলোজ বিদ্যমান।

বাজারে থাকা পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে সোনালি ব্যাগ চালু করার কাজ চলছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে দৈনিক ২৫ হাজার পিস সোনালি ব্যাগ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন। রাজধানীর ডেমরায় অবস্থিত লতিফ বাওয়ানী জুটমিলে সোনালি ব্যাগ তৈরির প্রাথমিক পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। বৃহৎ পরিসরে নতুন উদ্ভাবিত সোনালি ব্যাগ তৈরিতে দেশে বা বিদেশে কোনো মেশিন তৈরি হয়নি।তবে প্রাথমিকভাবে দেশীয় প্রযুক্তিতে মেশিন তৈরি করা হয়েছে। বহুমুখী পাটপণ্য তৈরির কাঁচামাল জোগান দিতে পদ্মার ওপারে ২০০ একর জমির ওপর দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পাটপল্লি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিথিনের বিকল্প হিসেবে শুধু পাটকে বিবেচনা করলে হবে না, এর পাশাপাশি অন্য প্রযুক্তির কথাও ভাবতে হবে। সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার থেকে দূরে সরে আসার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। জুটের পরে অন্য প্রাকৃতিক তন্তু যেমন কলাপাতা, কলাগাছ, নারিকেল, বেত ইত্যাদিকে ব্যবহারযোগ্য করার জন্য গবেষণা চলছে।
পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে পরিবাশবান্ধব, পচনশীল ও সহজলভ্য সোনালি ব্যাগ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকার বিদেশ থেকে মেশিনারিজ ক্রয়ের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। সম্পূর্ণ দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি এ ব্যাগ একদিকে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে প্রতিবছর পলিথিন ও এর কাঁচামাল আমদানি করতে যে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হতো তা সাশ্রয় হবে।

দুনিয়াব্যাপী পাটের ব্যাগের চাহিদা বৃদ্ধি ও আমাদের দেশের উন্নতমানের পাট এ দুই হাতিয়ার কাজে লাগিয়ে, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে আগামীতে ব্যবহারিক ও পরিবেশ রক্ষায় বহুল ব্যবহারের মাধ্যমে সোনালি আঁশ পাট ডায়মন্ড তন্তু হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত হবে।

লেখক: বিএস (কৃষি), এমএস (কৃষিতত্ত্ব), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

এসইউ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।