‘পানি ব্যবস্থাপনায় তরুণদের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক সিলেট
প্রকাশিত: ০১:০২ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২৩

তিন দিনব্যাপি ৮ম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে সম্মেলনের অগ্রগতির পথ হিসেবে নদীর অধিকার নিশ্চিত করতে তরুণদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করার উপর জোর দিয়েছেন আলোচকরা। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি নদীর জন্য একটি যুব প্ল্যাটফর্ম চালু করার প্রস্তাবনা আসে, যা নদী রক্ষাকারীদের কার্যক্রমকে নেতৃত্ব দেবে। আলোকচিত্র এবং জিপিএস ব্যবহার করে একটি নদীর মানচিত্রের ডাটাবেস স্থাপনে যুবকদের নিযুক্ত করার প্রস্তাবও আসে সম্মেলন থেকে। সর্বোপরি নদী ও পানি সংক্রান্ত বিষয়ে জনগণের সম্পৃক্ততা, সচেতনতা এবং আন্তঃসীমান্ত সংলাপ উন্নত করার পরামর্শ উঠে আসে সম্মেলন থেকে।

গত ২৫ জানুয়ারি বিকেলে ৮ম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি বলেন, ‘নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। নীতি ও কর্মের রূপান্তর করার জন্য আমাদের এখন শনাক্ত করতে হবে কীভাবে নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্যায়ন করা যায়।
সরকার বিবিএসের সহায়তায় প্রাকৃতিক সম্পদের হিসাব করার উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে নদীও একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। এটি দেশের জিডিপিতে প্রতিফলিত হবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্যায়নের ওপর বার্ষিক প্রকাশনা থাকবে।’

সাবের হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, ‘পানি ও এর ব্যবস্থাপনার মধ্যে যোগসূত্রকে সর্বত্র জোর দিতে হবে। যেহেতু আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে আছি এবং দেশের আরও উন্নয়ন ঘটছে। তাই পানি শাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠবে।’

তিনি পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত পানি জাদুঘরকে কীভাবে সমৃদ্ধ করা যায়, তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। পানি ও নদী সম্পর্কে মানুষের জানার জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি করার বিষয়েও অভিমত প্রকাশ করেন।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের আয়োজনে ‘জীবন-জীবিকার জন্য পানি এবং নদী: যুবদের ভূমিকা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে সিলেটে ২৩-২৫ জানুয়ারি ৮ম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কুশিয়ারা নদী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা পরিদর্শনের মাধ্যমে সম্মেলনের সূচনা হয়।

সম্মেলনে দেশি-বিদেশি নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সরকার প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের এক করে পানি ও নদী সম্পর্কিত সমস্যার ক্ষেত্রে যুব সংহতকরণের ওপর আলোকপাত করা হয়। সম্মেলনে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে পানি ও নদী শাসনে অবদান রাখতে পারে এমন বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় উঠে আসে।

সম্মেলনটি পাঁচটি বিষয়ভিত্তিক ক্ষেত্র- জলাশয় ইতিহাস, রূপবিদ্যা এবং পরিবর্তন; নদী একটি জীবন্ত সত্তা এবং নদীর উপর নৃতাত্ত্বিক হস্তক্ষেপের প্রভাব; পানি ও নদী অধিকারে যুব সম্পৃক্ততা; আন্তঃদেশীয় নদী ও পানি রাজনীতি; উদ্ভাবন, পানি, বাস্তুতন্ত্র ও টেকসই জীবিকাকে আবর্ত করে অনুষ্ঠিত হয়।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘নদীর প্রভাব আমাদের জীবন ও জীবিকার ওপর ব্যাপকভাবে রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে নদীগুলো দখল ও দূষিত হচ্ছে। নদীগুলোর আয়তনও সংকুচিত হচ্ছে দিন দিন। নদীর অস্তিত্ব ও প্রাণ আছে। জোর করে এর গতিপথ পরিবর্তন করা প্রকৃতি এবং মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। নদীগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত হতে দিতে হবে।’

সম্পদ মূল্যায়নে সাবের হোসেন চৌধুরীর উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘প্রাকৃতিক সম্পদ মূল্যায়ন করার জন্য সামাজিক সূচকের বৈশ্বিক মানদণ্ডের লিঙ্গ সংবেদনশীলতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘যেহেতু আমরা ৮ম আন্তর্জাতিক পানি সম্মেলন শেষ করছি, আমি বিশ্বাস করি এই সম্মেলনগুলো আমাদের সঠিক পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে সারাদেশ এবং দক্ষিণ-এশিয়া অঞ্চলের মানুষকে পানি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এ বছর যেহেতু আমরা নদীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তরুণদের সম্পৃক্ত করার গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছি, তাই নীতিনির্ধারকদেরও ভাবতে হবে কীভাবে দেশের ছাত্র সংগঠনগুলোকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি নদী ও পরিবেশের সমস্যাগুলোর পক্ষে সমর্থন করার জন্য সংগঠিত করা যায়।’

‘আন্তর্জাতিক এ সম্মেলন ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ এবং চীনের পানি এবং নদীগুলোর অভিন্নতা অনুসন্ধানের একটি দ্বার উন্মুক্ত করেছে। আমরা প্রতিটি দেশের নদী এবং এর দূষণের দিকে নজর দিতে পারি এবং ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের নদী রাজনীতির সমস্ত রূপ থেকে দূরে থেকে সর্বোত্তম অনুশীলনগুলো শেয়ার করার জন্য সংলাপের নিমিত্তে একটি আন্তঃসীমান্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারি।’ বলেন ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।

ভারতের পরিবেশ ও জলবায়ু সাংবাদিক জয়ন্ত বসু বলেন, ‘আমাদের একটি উপায় চিহ্নিত করতে হবে, যাতে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েরই উপকার করে। এসব নদীর পানির ওপর উভয় দেশের জনগণের সমান অধিকার রয়েছে। কারণ এসব নদীর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকাও জড়িত। কুশিয়ারা নদীর পানি বরাদ্দ চুক্তি অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর জন্য আলোচনার একটি প্রেক্ষাপট শুরু করেছে এবং আমাদের এই গতি ধরে রাখতে হবে।’

সম্মেলনে পোস্টডেম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট অ্যাকশন রিসার্চের বিজ্ঞানী মফিজুর রহমান, নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক এস এম মনজুরুল হান্নান খান, অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির ভাইস-চেয়ার ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. জহির বিন আলম, রিভারাইন পিপলের সাধারণ সম্পাদক শেখ রোকন, ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান, সেন্টার ফর আফ্রিকান স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক এবং ভাইস ডিরেক্টর ডা. ঝাং জিন, সাংহাই নরমাল ইউনিভার্সিটির কলকাতায় অবস্থিত লিভিং ওয়াটারস মিউজিয়ামের (এলডব্লিউএম) আর্ট অ্যান্ড আউটরিচ কো-অর্ডিনেটর সুকৃত সেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

ছামির মাহমুদ/এসইউ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।