হাওরে বন্যার আগেই ঘরে উঠবে ধান, বাকৃবি গবেষকদের সফলতা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বাকৃবি
প্রকাশিত: ০৩:২৬ পিএম, ০৬ মে ২০২৬
হাওরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান চাষে সফলতা পেয়েছেন বাকৃবির একদল গবেষক/ছবি-সংগৃহীত
  • ১৫-২০ দিন আগেই কাটা যাবে এই ধান
  • বন্যায় ডুবে যাওয়ার শঙ্কা নেই

প্রতি বছরই জলবায়ুজনিত নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হয় হাওরবাসী। ভূ-প্রাকৃতিক কারণেই সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় নিচু হওয়ায় আকস্মিক বন্যায় পুরো এলাকা পানিতে ডুবে যায়। এতে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয় পুরো হাওর। ফলে কৃষিব্যবস্থা এখানে অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান হলেও আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা ও ঠান্ডাজনিত চাপ উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে আগাম ও আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা। কৃষকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দেশের ধানের জোগানের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

এ সমস্যা উত্তরণে হাওরাঞ্চলে স্বল্প মেয়াদি বোরো ধান চাষ এবং বন্যার আগেই ফসল ঘরে তোলার গবেষণায় সফলতা পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।

সোমবার (৪ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান প্রামাণিক। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন গবেষণার সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলী ও গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা।

অধ্যাপক হাবিবুর রহমান প্রামাণিক তার গবেষণার বিষয়টি তুলে ধরে জানান, দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশ উৎপন্ন হয় বোরো মৌসুমে। আর মোট বোরো ধানের উৎপাদনের ১৮ শতাংশ হাওরাঞ্চলে উৎপন্ন হয়। তবে প্রায় প্রতি বছর আগাম বন্যায় ধানের ১০ শতাংশ, কখনো কখনো ১০০ শতাংশই ক্ষতির মুখে পড়ে। কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারেন না। এ পরিস্থিতিতে বন্যা শুরুর আগেই যদি ধান ঘরে তোলা যায়, তাহলে বন্যা থেকে ধানের ফসল পরিত্রাণ পাবে। এক্ষেত্রে হাওরে প্রচলিত দীর্ঘমেয়াদি বোরো ধানের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত চাষ করতে হবে। এতে ১৫-২০ দিন আগেই ফসল তোলা সম্ভব। এতে বন্যার ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

তিনি বলেন, ২০২০ সাল থেকে আমরা হাওরে স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান চাষে গবেষণা শুরু করি। হাওরে মূলত বোরো ধানই একমাত্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়। অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে হাওরের পানি নেমে গেলে ধান লাগানোর জন্য জমি ঠিক করা হয়। ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির শুরুতে ধান লাগানো হয়। প্রচলিত জাতের ধান বড় হতে এপ্রিলের শেষ বা মে মাস এসে যায়। তখনই হঠাৎ বন্যার পানি নেমে আসে। সাধারণত এপ্রিলের শেষে কিংবা মে মাসের শুরুতে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু করে। বিশেষ করে মে মাসে বন্যার প্রকোপ বেশি। এতে পুরো মাঠের ধান পানিতে ডুবে যায়। কৃষকরা শেষ সময়ে এসে ফসল ঘরে তুলতে পারেন না।

হাওরে বন্যার আগেই ঘরে উঠবে ধান, বাকৃবি গবেষকদের সফলতা

আগাম বন্যার তথ্য ও বিশ্লেষণ নিয়ে প্রধান গবেষক বলেন, ‌‘হাওরে আগাম বন্যার গত ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাওরে আকস্মিক বন্যার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি মে মাসে (প্রায় ৫০ শতাংশ)। এপ্রিলের শেষার্ধে প্রায় ৪২ শতাংশ এবং মার্চের শেষভাগে ও এপ্রিলের প্রথমার্ধে তুলনামূলক কম প্রকোপ দেখা গেছে। ফলে এপ্রিলের মাঝামাঝির আগেই ধান কাটতে পারলে ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমে।’

তিনি বলেন, ‘যেহেতু আগাম বন্যা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে শুরু হয়। কোনোভাবে যদি এর আগেই ধানের ফসল কর্তন করা যায়, তাহলে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। এই চিন্তা থেকে আমরা হাওরে স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান চাষ করছি। দেখা যায়, প্রচলিত বোরো ধানের তুলনায় স্বল্পমেয়াদি জাত ১৫-২০ দিন আগেই কর্তন সম্ভব। এতে বন্যায় সমসাময়িক থেকে কিছুটা আগেই কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারবে।’

আরও পড়ুন:
হাওরাঞ্চলে স্বস্তির রোদে ধান নিয়ে ব্যস্ত কৃষক
দুর্যোগ-দরপতনে দিশাহারা কৃষক
ফসলের সঙ্গে ডুবে গেল হাজারো কৃষকের স্বপ্ন

হাওরে স্বল্পমেয়াদি ধানের জাত নিয়ে অধ্যাপক প্রামাণিক বলেন, ‘হাওরে বহুল চাষকৃত ধানের জাত ব্রি ধান ৯২, যার জীবনকাল ১৬০। অগ্রহায়ণের প্রথমদিকে অথবা ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে এই জাতের ধান রোপণ করা হয়। তবে ধান পেকে কর্তন করতে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই সময়ে আগাম বন্যা নেমে আসে। ফলে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে ব্রি ধান ৯২ এর পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি জাত যেমন ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ১০১, ব্রি ধান ১১৩, ব্রি ধান ১০৫, ব্রি ধান ২৫ লাগালে বন্যার আগেই কর্তন সম্ভব। এসব জাতের জীবনকাল প্রায় ১৪৫ দিনের মতো। একই সময়ে রোপণ করে হাওরে প্রচলিত ধানের জাতের চেয়ে ১৫ দিন আগেই কর্তন করা যায়।’

হাওরে বন্যার আগেই ঘরে উঠবে ধান, বাকৃবি গবেষকদের সফলতা

হাওরে বোরো ধান উৎপাদনের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘হাওরে বোরো ধান চাষে বন্যার পাশাপশি আরও সমস্যা রয়েছে। যদি থোড় আসার সময় বাতাসের তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির কম হয় তাহলে ধান চিটা হবে। আবার ফুল আসার সময় বাতাসের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির বেশি হলে চিটা হবে। আবার বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রচুর বৃষ্টি শুরু হয়। শিলাবৃষ্টিতে গাছের ক্ষতি হয়। তাই এমন সময়ে ধান বপন করতে হবে যাতে ন্যূনতম এসব ক্ষতি এড়ানো যায়। আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো কৃষকরা চান দীর্ঘমেয়াদি অধিক ফলন দেওয়া ধান। স্বল্পমেয়াদি ধানে উৎপাদন এক থেকে দেড় টনের মতো কম হওয়ার কারণে কৃষক অনুৎসাহী হয়ে পড়েন। দীর্ঘমেয়াদি ধানে বন্যায় পড়লে শতভাগই ক্ষতির মুখে পড়বে। এটি তারা বুঝতে চান না অনেক সময়।’

স্বল্পমেয়াদি ধানে চাষের বিষয়ে বাকৃবির এই গবেষক বলেন, ‘আকস্মিক বন্যা পরিহারে এপ্রিলের প্রথমার্ধে বোরো ধান কর্তন করতে হলে অবশ্যই ১০ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে। এরই মধ্যে ব্রি ধান ৮৮ জাত ২৬ ডিসেম্বর রোপণ করে এপ্রিলের ৮ তারিখ কর্তন করতে পেরেছি। এতে বন্যার ক্ষতি থেকে ফসল মুক্ত। এর আগে সুনামগঞ্জে বন্যা আসার আগেই ধান কেটে ফেলতে পেরে কৃষকরা খুশি ছিলেন।’

বিভিন্ন জায়গায় স্বল্পমেয়াদি ধানে লাগিয়ে আগাম কর্তনের বিষয়ে অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘অষ্টগ্রামে ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ২৫ এর চারা ২ জানুয়ারি লাগিয়ে এপ্রিলের ১২ তারিখে কর্তন করা গেছে। ইটনায় স্বল্পমেয়াদি জাত ব্রি ধান ১১৩ জানুয়ারির ১০ তারিখে রোপণ করে ১৭ এপ্রিলের কর্তন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ব্রি ধান ৯২ এখনো কর্তন সম্ভব হয়নি।’

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাওরে যেহেতু স্বল্পসময়ে ধানের চারা রোপণ করতে হয়, আবার একই সময়ে ধান পরিপক্ব হয়, তাই বন্যার ক্ষতি এড়াতে হাওরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। আগাম বন্যা যেহেতু এপ্রিলের শেষার্ধে অথবা মে মাসের শুরু হয়, তাই কৃষির উন্নত ব্যবস্থাপনার জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, হারভেস্টার, সেচ সুবিধাসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ সহজলভ্য হবে। এতে দ্রুতই এবং একই সঙ্গে ফসল তোলা যাবে।’

এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।