নিভৃত পল্লীতে চিকিৎসার আলো ছড়াতেন ছানাউল্লাহ


প্রকাশিত: ০৪:৩৯ পিএম, ২০ মে ২০১৬

মীর সানাউর রহমান ওরফে ছানাউল্লাহ। যিনি বছরের পর বছর হাজার হাজার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে এসেছেন। প্রতি শুক্রবার শুধু চিকিৎসা সেবাই নয়, পরম মমতায় রোগীদের হাতে বিনামূল্যে পথ্যও তুলে দিতেন মহৎ প্রাণ এই মানুষটি। এই শুক্রবার দিনটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না !

অন্য শুক্রবারের মতোই আজও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার শিশির মাঠে চিকিৎসক ছানাউল্লাহর বাগান বাড়িতে হতদরিদ্র শত শত রোগীদের ভিড় ছিল। ভোর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে শত শত রোগী এসে ভিড় করেন চিকিৎসক ছানাউল্লাহর বাগান বাড়িতে। রোগীদের সবাই প্রতীক্ষায় আছেন কখন তাদের প্রিয় চিকিৎসক ছানাউল্লাহ আসবেন ! আসার সময়টাও ঠিকই ছিল। ঠিক সময়েই আসলেন। তবে জীবিত নয়, নিভৃত পল্লীতে বছরের পর বছর বিনামূল্যে চিকিৎসার আলো ছড়ানো সেই চিকিৎসক সানাউল্লাহ আসলেন লাশ হয়ে।

দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে চলে যেতে হলো নিভৃত পল্লীতে বছরের পর বছর বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী আলো ছড়ানো সেই চিকিৎসক ছানাউল্লাহকে। এ ঘটনায় চিকিৎসক ছানাউল্লাহর আপন ছোট ভাই আনিসুর রহমান ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সাইদুজ্জামান গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে প্রথমে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর সেখানে অপারেশন থিয়েটারে শিক্ষক সাইদুজ্জামানকে দুই ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়।

পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সাইদুজ্জামানকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দুপুরে হেলিকপ্টার যোগে ঢাকায় পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, সকাল ৯টার দিকে মজমপুর থেকে মোটরসাইকেল যোগে চিকিৎসক ছানাউল্লাহ তার ছোট ভাই আনিসুর রহমান এবং বন্ধু কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সাইদুজ্জামানকে নিয়ে বটতৈল শিশির মাঠে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য তার বাগান বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে পেছন দিক থেকে আসা তিন মোটরসাইকেল আরোহী তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে।

এসময় দুর্বৃত্তরা চিকিৎসক ছানাউল্লাহর মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর দুর্বৃত্তরা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইদুজ্জামান ও চিকিৎসক ছানাউল্লাহর আপন ছোট ভাই আনিসুর রহমানকেও কুপিয়ে জখম করে পালিয়ে যায়।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চাপাতি উদ্ধার করেছে। ঘটনার পরপরই কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন ও পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম সাংবাদিকদের জানান, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। চাপাতির আঘাতে শিক্ষক সাইদুজ্জামানের হাতের দুইটি আঙ্গুল কাটা পড়েছে। ঘটনাস্থল থেকে শিক্ষকের কাটা আঙ্গুল উদ্ধার করা হয়েছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ ১৩ বছর যাবত বিনামূল্যে বটতৈল ইউনিয়নের শিশিরমাঠ এলাকার নিজের বাগান বাড়িতে প্রতি শুক্রবারে রোগীদের বিনামূল্যে হোমিও চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন চিকিৎসক সানাউল্লাহ। চিকিৎসক ছানাউল্লাহর মৃত্যুতে ওই এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকাবাসী এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহাবুদ্দিন চৌধুরী জানান, চিকিৎসক ছানাউল্লাহর মাথার পেছনে তিনটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শিক্ষক সাইদুজ্জামানেরও মাথায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর চিহ্ন রয়েছে।

তিনি আরো জানান, হত্যাকাণ্ডের সঠিক কারণ জানা যায়নি। জমি-জমা সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জের ধরে এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা পুলিশ সে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

এ ঘটনায় থানায় এখনো কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। বিকেল ৫টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করাও সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে তিনি জানান, সানাউর ও সাইফুজ্জামান বাউল তত্ত্বের অনুসারী।

জানা গেছে, দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হোমিও চিকিৎসক সানাউর রহমান আগে ঠিকাদারি করতেন। আর তার একমাত্র ছেলে পাভেল রহমান (বিমান বাহিনীতে ট্রেনিংয়ের সময় ৬/৭ বছর আগে) দেখতে সস্ত্রীক চট্টগ্রামে গেলে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় সানাউরের স্ত্রী মারা যান।

এরপর ছেলে পাভেল বিমান বাহিনীর চাকরি ছেড়ে দেন। বর্তমানে তিনি সিলেটের একটি চা বাগানে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থক ডা. মীর সানাউর ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করতেন না। শুক্রবারে জুমার নামাজের সময়ও তিনি রোগী দেখতেন। সেই সঙ্গে তিনি প্রায়ই স্ত্রীকে নিয়ে মেহেরপুরের চার্চে যেতেন বলে তার একাধিক প্রতিবেশি জানিয়েছেন।

সূত্র আরো জানায়, গণপূর্ত অফিসের সামনে একটি মার্কেট ও বাড়ি ভাড়া দিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। সেই সঙ্গে হোমিও চিকিৎসাসহ ফ্রি ওষুধ দিতেন তিনি। বন্ধু শিক্ষক সাইফুজ্জামান বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার ব্যাপারে সানাউরকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছিলেন বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি বটতৈল ইউনিয়নের শিশিরমাঠ এলাকায় একটি চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে নিয়মিত ডা. ছানাউল্লাহ যেতেন বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি একটি পক্ষ ইউপি নির্বাচনে ডা. সানাউলের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা চেয়েছিল। ডা. সানাউলের ওই খামার বাড়ি চারজন যুবক দেখাশোনা করতো। সেখানে নিয়মিত বাউল গানের আসর বসতো।

ডা. সানাউলের খুনের ঘটনা সম্পর্কে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চার্চ ঘেষা ও বাউল ঘরানার কারণেই তিনি খুন হয়েছেন। তবে পুলিশ এটা সম্পর্কে মুখ খুলছে না।

এআরএ/জেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।