শিক্ষা-চিকিৎসাসহ কৃষিশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি বরগুনাবাসীর
উন্নয়ন বৈষম্য দূর করতে অনুন্নত ও দেশের সর্ব দক্ষিণের জেলা বরগুনার জন্য আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দাবি করেছেন এই জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মূলত মৎস্য ও কৃষিনির্ভর এই এলাকার মানুষ। তাই তারা চান আসন্ন বাজেটে মৎস্য ও কৃষিশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ুক। দক্ষিণাঞ্চলের বড় সমস্যা বৈষম্য দূর করতে বাড়াতে হবে কর্মসংস্থান।
এছাড়াও নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত এই জেলার মানুষ। প্রতি বছরই এই জেলায় হানা দেয় কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে মৎস্য ও কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি ঘটে প্রাণহানির মতো ঘটনাও। তাই এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান তারা।
এমনিতেই এই জেলার মানুষ পিছিয়ে পড়া। এদের এগিয়ে নিতে হলে বাজেটে বিশেষ প্যাকেজ রাখা প্রয়োজন। বৈষম্য রয়েছে কর্মসংস্থানেও। এই এলাকায় যাতে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়, মানুষের আয় বৃদ্ধি পায়, এজন্য সরকারকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বাড়ানোর দাবি করেছেন এই জেলার বাসিন্দারা।
বাজেট সামনে রেখে জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে বরগুনাকে দেশের সবচেয়ে গরিব ও অবহেলিত জেলা আখ্যায়িত করে এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন তারা। উচ্চশিক্ষার সুষম বিকাশে পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবও করেন তারা।
বরগুনা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, বরগুনা মূলত কৃষি ও মৎস্য নির্ভর অঞ্চল। কৃষি ও মৎস্য ছাড়া অন্য কোনো আয়ের পথ নেই এই জেলার দরিদ্র মানুষের। তাই বাজেটে কৃষকদের জন্য এমন কিছু করতে হবে যাতে কৃষকেরা উৎসাহিত হন।
এখানে একটি কৃষি ইপিজেড স্থাপন করতে হবে যাতে করে কৃষকেরা তাদের কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন। এছাড়াও ঢাকা এবং চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি কৃষিপণ্য ও মৎস্য পরিবহনের ব্যবস্থা করলে এখানকার কৃষক ও মৎস্যজীবীরা আরও উৎসাহিত হবেন।
এছাড়াও এই অঞ্চলে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষিশিল্প গড়ে উঠলে জাতীয় অর্থনীতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও জানান তিনি।
বরগুনার তরুণ সাংবাদিক সোহেল হাফিজ বলেন, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে সড়ক পথে মাত্র ৪০ মিনিটের পথ পেরুলেই পটুয়াখালী জেলা। যেখানে আরও একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
শুধু তাই নয়, বরিশাল পটুয়াখালীর এই স্বল্প দূরত্বের ব্যবধানে রয়েছে দু`দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ও। (পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় + বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)। অথচ বরগুনায় একটি মেডিকেল কলেজ হলে পিরোজপুর, বাগেরহাট, বরগুনা এবং কুয়াকাটা কলাপাড়াসহ এ উপকূলের ন্যূনতম অর্ধ কোটি মানুষ অধিকতর উপকৃত হবেন।
তিনি আরও বলেন, মেডিকেল কলেজের সঙ্গে থাকতো আধুনিক একটি হাসপাতাল যা অবহেলিত এ উপকূলের বঞ্চিত মানুষের চিকিৎসা সংকটকে নিরসন করতে পারতো। বরিশালের সঙ্গে বরগুনার যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিকল্প একটি সড়ক আছে।
তাছাড়া চীন সরকারের সহায়তায় আমতলী-বরগুনা রুটে পায়রা সেতু নির্মাণের বিষয়টি সরকারের ভাবনায় রয়েছে। সুতরাং বরগুনায় মেডিকেল কলেজ হওয়ার পেছনে কোনো প্রতিবন্ধকতাই থাকতে পারে না। তাই এই বাজেটেই বরগুনায় একটি মেডিকেল কলেজে নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
বরগুনার বিশিষ্ট সমাজসেবক শুখরঞ্জন শীল বলেন, দেশের কৃষি ভিত্তিক এই জেলায় অন্যান্য এলাকা থেকে ধান তরমুজ, সূর্যমুখী এবং আলুর ফলন অনেকে ভালো হয়। এখানকার কৃষকেরা আগ্রহ নিয়ে তা উৎপাদন করলেও তারা ন্যায্যমূল্য পান না।
তাই কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিক খাদ্যদ্রব্যের ন্যায্যমূল্য পান সেটি নিশ্চিত করতে বাজেটে কৃষি খাতের জন্য ভর্তুকিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ থাকা দরকার। তানা হলে কৃষকেরা ফসল উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. মোস্তফা চৌধুরী বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটায়। এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে সরকার প্রতি বছর হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব পেয়ে থাকেন। এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাওয়া সত্ত্বেও সরকার উপকূলীয় জেলেদের নিরাপত্তায় কোনো গুরুত্ব দেন না।
তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর জলদস্যুরা জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ, ট্রলার, মাছ ও রসদ সামগ্রী লুট করে শত কোটি টাকারও বেশি লুটে নেয়। অনেক সময় জলদস্যুদের অত্যাচর ও নির্যাতনে প্রাণ পর্যন্ত দিতে হয় জেলেদের।
তাই জলদস্যুদের অত্যাচারে অনন্যোপায় হয়েই ইতোমধ্যেই অনেক জেলে ও ট্রলার মালিকরা অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। অনেকে আবার নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন। এই জলদস্যু নির্মূল করতে না পারলে মৎস্য ক্ষেত্র হুমকির মুখে পড়বে। তাই জলদস্যু নির্মূলের জন্য ২০১৬-১৭ বাজেটে বিশেষ প্যাকেজ রাখারও দাবি জানান তিনি।
বরগুনা সরকারি কলেজের হিসাবজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাত দোলা বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি এই জেলা শিক্ষা ক্ষেত্রেও পিছিয়ে। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীরা অনেকে পিছিয়ে রয়েছে। অথচ এখানে শিক্ষা প্রসারের জন্য বাজেটে বিশেষ কোনো বরাদ্দ দেয়া হয় না। এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতে কর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা হয়, সেই বিষয়টিও বাজেটের পরিধিতে থাকতে হবে।
সদর উপজেলার কৃষক জামাল মিয়া বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকেরা এমনিতেই অবহেলিত। এখানে কৃষির জন্য অবশ্যই বাজেটে বিশেষ ভর্তুকি থাকতে হবে। কৃষিভিত্তিক কলকারখানা যাতে এই জেলায় গড়ে ওঠে বাজেটে তার প্রতিফলনও থাকতে হবে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যাতে নাগালের মধ্যে থাকে সেভাবেই বাজেট তৈরি করতে হবে। সরকার কোনো জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিলে সেটা বিক্রি করতে ক্রেতাদের সঙ্গে বেশি কথা খরচ করতে হয়। তাই চাই বাজেটে যেন কোনো জিনিসের দাম না বাড়ে।
এসএস/এমএস