কুষ্টিয়া

সার সংকটে বিপাকে পেঁয়াজ চাষিরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ১১:৪৬ এএম, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬

গেল বছর পেঁয়াজের ভালো দাম ছিল বাজারে। মৌসুমের শুরুতে ৩৫-৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। কয়েকমাসে আগেও বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১৩৫ টাকা কেজি। সেই পেঁয়াজ এখন বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে। আর প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকা। ফলে খরচ বাদ দিয়েও লাভ রয়েছে চাষিদের। তাই চলতি অর্থবছর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এ ফসল আবাদে আগ্রহ দেখা গেছে চাষিদের মাঝে।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে চাহিদামতো নন ইউরিয়া টিএসপি, এমওপি এবং ডিওপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি দিলে সার দিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১৮ হাজার ২৪০ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৪ হাজার ৯২০ হেক্টর জমি পেঁয়াজ চাষাবাদের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। বছর জুড়ে ভালো দাম পাওয়ায় পেঁয়াজ আবাদে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত জমিতে পেঁয়াজ চাষাবাদের প্রত্যাশা করছে কৃষি বিভাগ। জমি ভাড়া, বীজ, সার, চাষ ও পরিচর্যা বাবদ এ বছর প্রতি হেক্টরে খরচ পড়ছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। তবে সারের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট, নন্দলালপুর ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে ঘুরে দেখা যায়, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সী ২০ থেকে ৩০ জন দলবদ্ধভাবে চারা রোপণ করছেন। তারা জানান, চারা রোপণের ভরা মৌসুমে শ্রমিক চরম সংকট থাকে। এ সময় শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ নিজেদের জমিতে আবার অনেকে খরচ মেটাতে ৫০০ টাকা মজুরিতে মাঠে কাজ করেন।

এ সময় পান্টি ইউনিয়নের ভালুকা গ্রামের ইশাক আলীর ছেলে লাল্টু আলী শেখ বলেন, ‘গেল বছর পেঁয়াজের ভালো দাম ছিল। প্রতিকেজি পেঁয়াজ ৪০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। সে জন্য মানুষ অন্যান্য চাষ বাদ দিয়ে পেঁয়াজ চাষ করছেন। কিন্তু চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না।’

ভালুকা পূর্বপাড়া গ্রামের মৃত আবু দাউদ শেখের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করছি। ডিলার লাইন ধরিয়ে ন্যায্যমূল্যে ১০-২০ কেজির বেশি সার দিচ্ছে না। তবে সাব ডিলাররা বস্তা ধরে সার দিচ্ছে না। কিন্তু বস্তাপ্রতি ৫০০-৭০০ টাকা বেশি নিচ্ছে। ভবিষ্যতে সার পাবে না, এ ভয়ে সাব ডিলারের নাম বলেননি তিনি। তার ভাষ্য, ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সাব ডিলারদের মাধ্যমে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে।’

আরও পড়ুন
পেঁয়াজ চাষ করে কৃষকের মাথায় হাত
ঋণের দায়ে পালানোর উপক্রম পাবনার পেঁয়াজ চাষিদের

যদুবয়রা ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের জহির হোসেনের ছেলে আবু বাদশা চলতি মৌসুমে প্রায় ১৩ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জমির ইজারা, চাষ, চারা রোপণ ও পরিচর্যা বাবদ প্রতি বিঘা জমিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার খরচ হয়। আর ৬০ থেকে ৭০ মণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তাতে পেঁয়াজ চাষ করে চাষিরা খুবই লাভবান হচ্ছে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বিঘাপ্রতি ১০ কেজির বেশি সার দেয় না ডিলার। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে সার কেনা হচ্ছে। এতে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।’

লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত জনাব আলীর ছেলে আক্কাস আলী মোল্লা বলেন, ‘প্রায় তিন বিঘা জমিতে পেঁয়াজ করেছি। কয়েক বছর হলো সারের খুব সংকট। বেশি টাকায় সার কিনে চাষ করতে গিয়ে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। কৃষকরা চরম সংকটে আছে। সরকার যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।’

একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এক হাজার ৩৫০ টাকা বস্তা টিএসপি সার এক হাজার ৮৫০ থেকে দুই হাজার টাকা, এক হাজার ৫০ টাকা বস্তা ডিএপি সার এক হাজার ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং এক হাজার টাকা বস্তা এমওপি সার এক হাজার ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে সাব ডিলার ও খোলাবাজারে।

কৃষকদের অভিযোগের কথা স্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি খন্দকার আব্দুল গাফফার বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী সার দিচ্ছে না সরকার। মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেও সারের জোগান হয়নি। ফলে কৃষকদের চাহিদা মতো সার দিতে পারছেনা ডিলাররা। তবে কোনো ডিলার অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে না।’

তার ভাষ্য, ‘সাব ডিলার ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন স্থান থেকে সার সংগ্রহ করে বেশি দামে বিক্রি করছে। এদের আইনের আওতায় আনা দরকার।’

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ন্যায্যমূল্যে সার বিক্রি করা হচ্ছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি দামে সার বিক্রি করছিল। তাদের অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে।’

সার নিয়ে ডিলাররা কোনো সিন্ডিকেট করলে তা খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, ‘কৃষকরা যেন সরকারি দামে এবং চাহিদা অনুযায়ী সার পাই, সেই লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে প্রশাসন।’

আল-মামুন সাগর/আরএইচ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।