হাতিয়ায় ৬ খুন

মামলায় নির্বাচনি প্রভাব, ওসির বিরুদ্ধে আসামি পরিবর্তনের অভিযোগ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নোয়াখালী
প্রকাশিত: ০৯:৫১ পিএম, ০৫ জানুয়ারি ২০২৬
হাতিয়া থানার ওসি মো. সাইফুল আলম

নোয়াখালীর হাতিয়ায় চর দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় থানায় দুটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব মামলায় নির্বাচনি প্রভাব বিস্তারে পক্ষে-বিপক্ষের আসামি দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। মামলার বাদীকে থানায় আটকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এজাহারে আসামির নাম পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে।

সোমবার (৫ জানুয়ারি) নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, থানা ও আদালত ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৩ ডিসেম্বর হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চরে দিনভর চরের ভূমি দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী আলাউদ্দিন বাহিনী, শামছু বাহিনী ও ফরিদ কমান্ডার বাহিনীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে ফরিদ কমান্ডার বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে গেলেও আলাউদ্দিন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন, কোপা শামছু বাহিনীর প্রধান কোপা শামছু, তার ছেলে মোবারক হোসেন শিহাবসহ ছয়জন নিহত হন।

এ ঘটনায় গত ২৫ ডিসেম্বর নিহত কোপা শামছুর বড় ভাই আবুল বাসার বাদী হয়ে হাতিয়া থানায় চরকিং ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মনির মেম্বারকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন। মামলায় ৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

পরদিন নিহত আলাউদ্দিনের বাবা মহিউদ্দিন বাদী হয়ে আগের মামলার বাদী জাহাজমারা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল বাসারকে প্রধান আসামি করে ২১ জনের নামে আরেকটি হত্যা মামলা করেন। তবে সোমবার (৫ জানুয়ারি) পর্যন্ত এসব মামলার কোনো আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

মামলায় নির্বাচনি প্রভাব, ওসির বিরুদ্ধে আসামি পরিবর্তনের অভিযোগ

মামলার বাদী মহিউদ্দিনের অভিযোগ, হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম তাকে তুলে নেন। পরে আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার এজাহারে মনগড়া আসামিদের নাম দিয়ে মামলা রেকর্ড করেছেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) নোয়াখালী জেলা প্রশাসক বরাবর তিনি লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিযোগে মহিউদ্দিন উল্লেখ করেন, হত্যার ঘটনায় আমি বাদী হয়ে হাতিয়া থানায় মামলা করতে গেলে থানার ওসি সাইফুল আলম রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতার সন্ত্রাসী লোকজনের সহযোগিতায় আমাকে থানায় আটকে রাখেন। তাদের মনমতো নিরপরাধী কিছু লোকজনের নাম দিয়ে এজাহার লিখে আমার কাছ থেকে জোরপূর্বক সই নিয়ে থানায় মামলা রেকর্ড করেন।

মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাকে আটকের পর সুখচর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. সেলিম থানায় গিয়ে ওসির কথামতো কাজ করতে বলেন। অন্যথায় ছেলের মতো আমাকেও হত্যার হুমকিসহ ভয়ভীতি দেখানো হয়। সেলিম মেম্বার নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মো. মাহবুবের রহমান শামীমের ঘনিষ্ঠ লোক বলে পরিচিত। ওই এজাহারে বিএনপির প্রার্থী শামীমের প্রতিপক্ষ এনসিপির প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ লোকের নাম দেওয়া হয়েছে। এদের অনেককে আমি চিনি না।’

মামলায় নির্বাচনি প্রভাব, ওসির বিরুদ্ধে আসামি পরিবর্তনের অভিযোগ

তিনি আরও বলেন, ‘মামলার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ আমাকে ঢাকায় ডেকে নেন। তিনি ওসির বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ এবং মামলায় আমার দেওয়া এজাহার প্রত্যাহার ও নতুন আরেকটি এজাহার তৈরি করে দিয়ে তা আদালতে দাখিল করতে বলেন। আমি সেই মতে আইনজীবীর মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

আরও পড়ুন:
নোয়াখালীতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ৫
হাতিয়ায় সংঘর্ষ: সামছু বাহিনীর প্রধানের মরদেহ উদ্ধার, মামলা

অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া মহিউদ্দিনের অভিযোগে অপর মামলার বাদী আবুল বাসারকেও ওসি সাইফুল আলম আটকে রেখে নিরপরাধ ফারুক, আরিফ, লাভলু, হাসান, জহিরসহ বেশ কয়েজনকে আসামি করার কথা উল্লেখ করেন। তবে মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় বারবার চেষ্টা করেও ওই মামলার বাদী আবুল বাসারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সুখচর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. সেলিমকেও বারবার ফোন দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। তাই তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হাতিয়া আদালতের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) দিলিপ কুমার জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাতিয়ায় ছয় খুনের ঘটনায় দুটি মামলার নথি আদালতের কাছে রয়েছে। এখনো কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি।’

হাতিয়া থানার ওসি সাইফুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুজন বাদী হয়ে দুটি হত্যা মামলা করেছেন। তবে কোনো বাদীকে আটকে বা ভয়ভীতি দেখিয়ে আসামি পরিবর্তনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। মামলার আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

এ বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঘটনাটি আমার নির্বাচনি এলাকার। ওই হত্যা মামলায় আমাদের ছাত্রশক্তির কয়েকজনকে মিথ্যা আসামি করা হয়েছে। তাই বাদীসহ আমি অভিযোগ দিতে জেলা প্রশাসকের কাছে গিয়েছিলাম। তবে মামলা প্রত্যাহার বা নতুন এজাহার দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেদিন বাদী মহিউদ্দিনকে থানায় ছয় ঘণ্টা আটক রেখে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন ওসি সাইফুল আলম। থানার সিসিটিভি ফুটেজে তার প্রমাণ আছে। ডিসি-এসপি এ ব্যাপারে ব্যবস্থা না নিলে আমি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দেবো।’

মামলায় নির্বাচনি প্রভাব, ওসির বিরুদ্ধে আসামি পরিবর্তনের অভিযোগ

অন্যদিকে, নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মো. মাহবুবের রহমান শামিম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলবো না।’

নোয়াখালী পুলিশ সুপার টিএম মোশাররফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাতিয়া থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ হাতিয়া থানায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার একজন বাদীকে আটকে এজাহার পরিবর্তনের একটি অভিযোগ দিয়েছেন। তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে বলা হয়েছে।’

ইকবাল হোসেন মজনু/এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।