শার্শায় বাড়ছে কুল চাষ, কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
শীতের আমেজ শুরু হতেই যশোরের শার্শার বেলতলা বাজারে নেমে এসেছে ভিন্ন এক উৎসবের আমেজ। কুয়াশাভেজা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারজুড়ে এখন শুধুই টাটকা কুলের ঘ্রাণ আর বেচাকেনার প্রাণচাঞ্চল্য। মৌসুমি ফল কুলকে ঘিরে এই বাজার এখন দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলের হাটে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এক সময় শার্শার মাঠে কুলের চাষ সীমিত থাকলেও এখন তা কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শার্শা ও পার্শ্ববর্তী সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে কুলের বাগান গড়ে উঠেছে। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই নতুন নতুন কৃষক এই চাষে ঝুঁকছেন, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বেলতলা বাজারে।
স্থানীয় কুল চাষি আকসেদ আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি দুই বিঘা জমিতে কুলের আবাদ করেছেন। গত বছরের তুলনায় ফলন কিছুটা কম হলেও বাজারে ভালো দাম পাচ্ছি। বেলতলা বাজারের বড় সুবিধা হলো এখানে সঠিক ওজন নিশ্চিত করা হয়, কোনো ধরনের কারচুপি নেই। এতে আমরা চাষিরা ন্যায্য লাভ পাচ্ছি।

প্রতিদিন বাজারে উঠছে বিভিন্ন জাতের কুল-বল সুন্দরী, থাই, চায়না, আপেল ও টক কুল। জাতভেদে দামে তারতম্য থাকলেও সব ধরনের কুলই দ্রুত বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বড় বড় শহরে কুলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এখান থেকে প্রতিদিন ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে কুল পাঠানো হচ্ছে।
ঝিনাইদহ থেকে আসা ফল ব্যবসায়ী মুজাহিদ বলেন, আমি প্রায় ১৭ বছর ধরে ফলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। শীত এলেই বেলতলা বাজারে আসি। এ বছর কিছু এলাকায় ফলন কম হলেও চাহিদা বেশি থাকায় দাম ভালো। তুলনামূলক বেশি দামে কিনেও অন্য বাজারে ভালো লাভ করা যাচ্ছে।
বাজারের স্থানীয় আড়তদার সালাউদ্দীন মুকুল, মিনারুল, কামাল ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, গত বছরের তুলনায় এবার কুলের চাহিদা ও কেনা-বেচা দুটোই বেড়েছে। তারা বলেন, আমাদের বাজারে ন্যায্য দামে ও সঠিক ওজনে কুল বিক্রি হয়। প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত টানা বেচাকেনা চলে। দাম ভালো থাকায় চাষি ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট।

বেলতলা বাজার ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মুন্না বলেন, কুলকে ঘিরে এ বাজারের সম্ভাবনা অনেক বড়। চাষি ও ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন। যেভাবে কুল চাষ বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে বেলতলা বাজার দক্ষিণাঞ্চলে আমের বাজারের মতো কুলের বাজার হিসেবেও পরিচিতি পাবে।
শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১৩৮ হেক্টর জমিতে কুলের চাষ হয়েছে। তিনি বলেন, বল সুন্দরী, থাই, আপেল, চায়না, নারকেল ও টক কুলের চাষ বেশি হয়েছে। ফলন ও বাজারমূল্য ভালো থাকায় চাষিরা লাভবান হয়েছেন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে কুল চাষ আরও বাড়বে।
তিনি জানান, শীতের এই সময়ে বেলতলা বাজার তাই শুধু একটি ফলের বাজার নয় এটি শার্শা উপজেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। কুলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বাণিজ্যিক গতিশীলতা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করছে। মাঠের কুল এখন শার্শার হাসির কারণ যেখান থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে।
মো. জামাল হোসেন/কেএইচকে/এমএস