দেশ পেরিয়ে বিদেশে যাচ্ছে কুমিল্লা বিসিকের সেমাই
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরী কুমিল্লার তৈরি সেমাইয়ের সুনাম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। এখানকার উৎপাদিত সেমাই দেশের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে বিদেশে। বর্তমানে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও ভারতে রপ্তানি হলেও আগামীতে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়াও এখানকার তৈরি সেমাই বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও জামালপুরসহ অন্তত ২৫টিরও বেশি জেলায়।
ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে রমজানের শুরু থেকেই সেমাই তৈরির ধুম লেগেছে কুমিল্লায় কারখানাগুলোতে। ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে কারিগরদের ব্যস্ততা ততই বাড়ছে। রাসায়নিক ও কৃত্রিম রং ছাড়া উৎপাদিত হওয়ায় কুমিল্লার সেমাইয়ের চাহিদা রয়েছে দেশব্যাপী।
কুমিল্লা বিসিক শিল্পনগরীতে গিয়ে জানা যায়, খন্দকার ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ, কুমিল্লা ফ্লাওয়ার মিল, গাউছিয়া ফুড, আরব সুইটস, সততা বেকারি, মেট্রো কনফেকশনারি, রিয়াজ ফ্লাওয়ার মিল ও মক্কা কনজুমার অ্যান্ড ফুড প্রোডাক্টসহ অন্তত ১০টি কারখানায় সেমাই উৎপাদন করা হচ্ছে। কারখানাগুলোতে বাংলা, বার্মা চিলি ও লাচ্ছা নামের তিন প্রকারের সেমাই উৎপাদন করা হয়।
সেমাই তৈরির কারখানাগুলোতে দেখা যায়, সেমাই তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। কেউ মেশিনে নানা উপকরণ মিশিয়ে ময়দা দিয়ে সেমাই তৈরির জন্য প্রস্তুত করছেন। কেউবা উৎপাদিত কাঁচা সেমাই শুকানোর জন্য নিয়ে যাচ্ছেন ছাদে। আবার কেউ শুকানো সেমাই ভাজছেন লাকড়ির চুলায়। শ্রমিকদের কেউ কেউ সেসব সেমাই হাতে প্যাকেট করছেন।

খন্দকার ফুড ইন্ডাস্ট্রিজে গিয়ে দেখা যায়, মেশিনে গর গর শব্দে বাংলা সেমাই উৎপাদন করা হচ্ছে। সেই সেমাই রুমের ভেতরে শুকানো হচ্ছে। ঈদ বাজারের চাহিদা মেটাতে দ্রুত প্যাকেটজাত করছেন শ্রমিকরা। বেশি কাজে বেশি আয়, তাই তারাও উৎসবের আমেজে কাজ করছেন। ঘণ্টায় একজন শ্রমিক দুই থেকে আড়াইশ প্যাকেট করছেন। কেউ প্যাকেট করা, কেউ ওজন করা, কেউ মুখ লাগানোর কাজ করছেন। আবার কেউ কার্টনে সেমাই ভরছেন।
এদিকে নিচতলায় ভারতের আসামে পাঠানোর জন্য কভ্যার্ডভ্যানে সেমাইয়ের কার্টন তুলে দেওয়া হচ্ছে।
খন্দকার ফুড ইন্ডাস্ট্রিজে কর্ণধার মো. ফিরোজ খন্দকার বলেন, ২০২২ সাল থেকে দেশের বাইরে বিস্কুট ও চানাচুরসহ বিভিন্ন প্রোডাক্ট রপ্তানি করছি। ২০২৩ সাল থেকে ভারত ও মালয়েশিয়ায় সেমাই রপ্তানি শুরু করি। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মালয়েশিয়া, বিবির বাজার দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা ও গোয়াইনঘাট দিয়ে ভারতের আসামে রপ্তানি করছি। আগামীতে দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
কুমিল্লা ফ্লাওয়ার মিলসের নারী শ্রমিক সুমাইয়া আক্তার বলেন, ঈদকে সামনে রেখে উৎপাদিত সেমাই আমরা দ্রুত প্যাকেটজাত করছি। ঘণ্টায় তিনজন শ্রমিক ২০০ থেকে ৩০০ সেমাইয়ের প্যাকেট প্রস্তুত করতে পারেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এই কাজ করার চেষ্টা করছি।

সেমাই তৈরির কারিগর মো. ফজলে রাব্বী বলেন, লাকড়ির আগুনে সেমাই ভাজা হলে এর স্বাদ ভালো থাকে। তাই আমরা সবসময় লাকড়ির আগুনে সেমাই ভাজি। ঈদের অল্প কয়েক দিন বাকি, প্রতিটা মিনিটের দাম অনেক বেশি। কারণ আমাদের সেমাইয়ের চাহিদা দেশব্যাপী।
কুমিল্লা ফ্লাওয়ার মিলসের পরিচালক সৈয়দ ইবনুল কাদের বলেন, আমরা সারাবছর সেমাই উৎপাদন করি না। প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ সামনে রেখে চিকন বাংলা সেমাই উৎপাদন করছি। মূলত রমজান শুরুর মাস খানেক আগে থেকেই সেমাই তৈরির কাজ শুরু হয়। আমরা সেমাই তৈরিতে কোনো রাসায়নিক বা রং ব্যবহার করি না। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গুণগত মান বজায় রেখে সেমাইয়ের ব্যবসা করছি। নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সীমিত লাভে সেমাই বিক্রি করে থাকি।
বিসিক কুমিল্লার ডিজিএম মো. মুনতাসীর মামুন জাগো নিউজকে বলেন, কুমিল্লা বিসিক শিল্প নগরীর ১০টি প্রতিষ্ঠান সেমাই উৎপাদন করে থাকেন। এক প্রতিষ্ঠানের সেমাই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশের অন্তত ২৫টিরও বেশি জেলা সরবরাহ করা হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিও সেমাই রপ্তানিতে চেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আশা করি আগামীতে বিশ্ববাজারে কুমিল্লার সেমাই সমাদৃত হবে। কারখানাগুলি স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এবং রাসায়নিক ও রং ব্যবহার করেই এই খাদ্য উৎপাদন করা হয়। এ বিষয়ে আমাদের সার্বক্ষণিক তদারকি রয়েছে বলেও তিনি জানান।
এমএন/এমএস