মাদক নিয়ন্ত্রণের আড়ালে উপপরিদর্শকের ‘বাণিজ্য’
নাম আকবর আলী। পেশায় খুলনা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক। মাদক নিয়ন্ত্রণ করা তার কাজ হলেও উল্টো মাদক কারবারিদের সঙ্গে আঁতাত রয়েছে তার। প্রতিমাসে নেন মাসোহারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি জাগো নিউজের অনুসন্ধানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এ কর্মকর্তার বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপপরিদর্শক আকবর আলী খুলনার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন। মাদকসহ গ্রেফতার করলেও মামলা না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে তিনি ছেড়ে দেন। এমনকি সেই শর্তে মাসোহারাও নেন আকবর আলী। প্রতিমাসে ৩-৪ লাখ টাকা তিনি বিভিন্ন মাদক কারবারির কাছ থেকে আদায় করেন। অনেক মাদক কারবারিকে ব্যবহার করে তিনি অন্যদেরকে ভয়ভীতিও দেখান।
জাগো নিউজের হাতে আসা একাধিক তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, নগরীর নতুন বাজার, রুপসা স্ট্যান্ড রোড বাজার, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাট এলাকা, বার্মাশীল রোড এলাকা, রুপসা উপজেলা, বটিয়াঘাটা উপজেলা, পাইকগাছা উপজেলা, মিস্ত্রিপাড়া এলাকা এবং রুপসা ব্রিজসহ একাধিক পয়েন্টের মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করেন আকবর আলী। এমনকি অভিযানে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্য সেসব কারবারিদের দিয়ে বিক্রিও করান তিনি। প্রায় চার মাস আগে এক লাখ টাকার বিনিময়ে বটিয়াঘাটা উপজেলার একজন মাদক কারবারিকে ছেড়ে দেন আকবর আলী।
খুলনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক আকবর আলী/ছবি-সংগৃহীত
খুলনার মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্র বলছে, গত ২৫ মার্চ উপপরিদর্শক আকবর আলী খুলনার পাইকগাছা উপজেলার মাদক কারবারি মুকুল কুমার গাইনের বাসায় অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় ৮৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হলেও মামলায় দেখানো হয় মাত্র ১০ বোতল ফেনসিডিল। এমনকি মাদক কারবারির বাসা থেকে পাওয়া আড়াই লাখ টাকা জব্দ না করে নিজেই হাতিয়ে নেন।
আরও পড়ুন: কুরিয়ারে পাঠাতেন ইয়াবা, চট্টগ্রামে গ্রেফতার একই পরিবারের ৬ জন
বাধ্যতামূলক হচ্ছে কারা গাড়িচালকদের ডোপ টেস্ট
মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয় সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়: সংস্কৃতি মন্ত্রী
মাদক-জুয়া বন্ধে কঠোর নির্দেশনা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা ডিএনসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ধরনের অপরাধ কেউ একা করতে পারে না। অবশ্যই আকবর আলীকে কেউ শেল্টার দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে উপপরিচালকের নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা উঠাচ্ছেন আকবর আলী। অনেক সময় তিনি মাদক উদ্ধার করে মামলাও করেন না। বিষয়টা ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে। আমরা ভাই, ছোট চাকরি করি। পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি আর করতে পারবো না।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাইকাগাছায় এর আগে একবার অভিযান চালানোর সময় আকবর আলীসহ কয়েকজনকে আটকে রাখেন এলাকাবাসী। বিষয়টি পরে খুলনা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. আহসানুর রহমানকে জানালে তিনি আকবর আলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। কিন্তু সে নোটিশও পরে ধামাচাপা পড়ে যায়।’
অভিযোগের বিষয়ে উপপরিদর্শক আকবর আলী বলেন, ‘হারাম একটা টাকা আমি খাইনি। আর ১০ বোতলের বেশি ফেনসিডিল উদ্ধার হয়নি। ফেনসিডিল বেশি উদ্ধার হলে তা দিয়ে আমি কী করবো, ভাই?’
মাদক কারবারির বাসায় অভিযান চালিয়ে মামলা না দিয়ে টাকা নিচ্ছেন উপপরিদর্শক আকবর আলী/ছবি-সংগৃহীত
তিনি আরও বলেন, মুকুল কুমার গাইনের বাসায় কোনো টাকা উদ্ধার হয়নি। আমি কোনো জায়গা থেকে টাকা-পয়সা তুলি না।
খুলনা জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মলয় ভূষন চক্রবর্ত্তী বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবো।
কারণ দর্শানোর নোটিশ
জানতে চাইলে খুলনা বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আহসানুর রহমান বলেন, ‘পাইকগাছার ঘটনায় তাকে (আকবর আলী) শেষবারের মতো সতর্ক করা হয়েছিল। এবার এমন ঘটনা ঘটলে এবং তথ্য প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসআর/জেআইএম