সিলেটে হামের টিকার দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হাজারো শিশু

আহমেদ জামিল
আহমেদ জামিল আহমেদ জামিল , জেলা প্রতিনিধি সিলেট
প্রকাশিত: ০১:০৬ পিএম, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
ফাইল ছবি

লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা
প্রচারণা কম, তদারকির অভাবে টিকার চিত্র উদ্বেগজনক
প্রথম ডোজ নিলেও দ্বিতীয় ডোজে অনীহা, বিপদে শিশুরা

সিলেটে নিয়মিত হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কার্যক্রম চললেও তদারকির ঘাটতি ও সচেতনতার অভাবে প্রতিবছরই হাজারো শিশু দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যেমন পিছিয়ে পড়ছে স্বাস্থ্য বিভাগ, তেমনি হামের ঝুঁকিতেও থাকছে শিশুরা।

শুধু তাই নয়, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় ঘাটতি। খোদ সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন অনেক কম।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের দ্বিতীয় ডোজ না দেওয়ায় ঝুঁকিতে পড়তে পারে শিশুরা। সম্প্রতি সারাদেশের মতো সিলেটেও বাড়ছে হাম আক্রান্তদের সংখ্যা।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, সিলেটে শনিবার (৪ এপ্রিল) পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭০ জন। শেষ ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা করে ৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে ৩০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

গত তিন বছরে সিলেটে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার সরকারি তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জেলায় টিকার লক্ষ্যমাত্রা যেমন কমছে, তেমনি প্রতি বছর টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ থেকে ঝরে পড়ছে গড়ে আড়াই হাজারেরও বেশি শিশু।

‘হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে বাসা পরিবর্তন করেছিলাম। নতুন বাসার কাছে টিকাকেন্দ্রে যাওয়ার পর তারা দ্বিতীয় ডোজ দেয়নি, প্রথম ডোজ যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে সেখান থেকে নেওয়ার কথা বলে। পরে আর পুরোনো ঠিকানায় গিয়ে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়নি।’

পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সিলেট জেলায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৮৫৭ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ (০-১১ মাস) পেয়েছিল ৮৪ হাজার ৬৩৫ জন শিশু। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ৮২ হাজার ৯৬০ জন শিশু। এবছর জেলায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে ১ হাজার ৬৭৫ জন।

একই বছরে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ হাজার ৭৩০ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছিল ১৫ হাজার ৫২৩ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১৫ হাজার ১১৪ জন শিশু। এবছর সিটি করপোরেশন এলাকায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ৪০৯ জন।

২০২৪ সালে সিলেট জেলায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৫ হাজার ৭৫৬ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছে ৮১ হাজার ৭৭৮ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৭৯ হাজার ৮৬০ জন শিশু। এ বছর জেলায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে ১ হাজার ৯১৮ জন।

আরও পড়ুন-
৫ বছরের কম বয়সী সব শিশু পাবে, আগে নেওয়া থাকুক বা না থাকুক
সচেতনতার অভাব ও সিস্টেম দুর্বলতায় হামের বিস্তার
হাম উপসর্গে সন্তানের মৃত্যুর তিনদিন পর আইসিইউ থেকে ফোন পেলেন বাবা

এ বছর সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ হাজার ৬৫৬ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছে ১৪ হাজার ৫২৭ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১৩ হাজার ৯১১ জন শিশু। এবছর সিটি করপোরেশন এলাকায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ৬১৬ জন।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে জেলার ১৩ উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮২ হাজার ২৬৭ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছে ৭৬ হাজার ৩৫৬ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৭৪ হাজার ৩০৪ জন শিশু। গত বছর জেলায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ২ হাজার ৫২ জন।

একই বছরে সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৭২০ জন। এর মধ্যে প্রথম ডোজ পেয়েছে ১৪ হাজার ৪৮০ জন শিশু আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে ১৩ হাজার ৫৭১ জন শিশু। গত বছর সিটি করপোরেশন এলাকায় দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে ৯০৯ জন।

‘হামের টিকার প্রথম ডোজ ও দ্বিতীয় ডোজের পার্থক্যের কারণ হলো অনেক অভিভাবক দ্বিতীয় ডোজটি দিতে চান না। এতে হাম রোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টিকার এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া এবং দ্বিতীয় ডোজ থেকে শিশুদের ঝরে পড়া ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। এর ফলে শিশুরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মাঠ পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং টিকাদান কেন্দ্রের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে এই হার আরও কমতে পারে।

সিলেটের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের টিকার আওতায় আনতে নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

কিন্তু অভিভাবকরা বলছেন, রুটিন টিকার ক্ষেত্রে প্রচারণার মধ্যে কেবল একটি ব্যানার সাঁটানো ছাড়া দৃশ্যমান প্রচারণা নেই। একসময় মসজিদের মাইকে টিকা দেওয়ার কথা জানানো হলেও এখন আর সেটি হয় না।

নগরীর বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী কয়েস চৌধুরী বলেন, রুটিন টিকার ক্ষেত্রে কোনো প্রচারণা চালাতে দেখা যায় না। মাঝে মধ্যে পোলিও টিকা দেওয়ার সময় মাইকিং করা হয়।

তিনি বলেন, টিকাদনকর্মীরা যেদিন টিকা দেন, সেদিন কেন্দ্রের সামনে একটি ব্যানার টানিয়ে রাখেন। অভিভাবকরা নিজ দায়িত্বে শিশুদের নিয়ে টিকা দেন।

শামীমাবাদ এলাকার বাসিন্দা গৃহকর্মী রুমানা আক্তার বলেন, হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পরে বাসা পরিবর্তন করেছিলাম। নতুন বাসার কাছে টিকাকেন্দ্রে যাওয়ার পর তারা দ্বিতীয় ডোজ দেয়নি, প্রথম ডোজ যেখান থেকে নেওয়া হয়েছে সেখান থেকে নেওয়ার কথা বলে। পরে আর পুরোনো ঠিকানায় গিয়ে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়নি।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, হামের টিকার প্রথম ডোজ ও দ্বিতীয় ডোজের পার্থক্যের কারণ হলো অনেক অভিভাবক দ্বিতীয় ডোজটি দিতে চান না। এতে হাম রোগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, অভিভাবকদের অসচেতনতা কাটাতে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন এবং টিকাদানের আগের দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকজনকে জানিয়ে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অভিভাবকদের অনীহা ও অসচেতনতার কারণে শিশুরা সময়মতো টিকা পাচ্ছে না। অভিভাবকদের এ ব্যাপারে আরও সচেতন হওয়ার কথা বলেন তিনি।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, রুটিন মাফিক প্রতিবছরই হামের দুই ডোজ টিকা দেওয়া হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পেইন করে হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে না। হয়ত এজন্য কিছু শিশু বাদ পড়ছে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।