শরীয়তপুরে সরকারি চাল নিয়ে প্রশাসনের ‘চালবাজি’
শরীয়তপুরের আংগারিয়া খাদ্য গুদাম থেকে বের হওয়া বিপুল পরিমাণ সরকারি চাল পরিবহন নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে বের হয়েছে এমন অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়রা অন্তত দুই দফায় ট্রাকসহ চালগুলো আটক করে একাধিকবার প্রশাসনকে জানালেও তারা এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি সচেতন মহলের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে আংগারিয়া খাদ্য গুদাম থেকে একটি ট্রাকে করে সরকারি সিলযুক্ত অন্তত ৪০০ বস্তা চাল কোটাপাড়া এলাকায় নেওয়া হচ্ছিলো। ট্রাকটি শহরের পালং মডেল থানা সংলগ্ন সড়কে পৌঁছালে স্থানীয় জনতার সন্দেহ হলে তারা সেটি থামায়।
এসময় তারা সেগুলো ওজনের উদ্দেশ্যে প্রেমতলা এলাকায় নিচ্ছিলো বলে জানায়। পরে স্থানীয়রা ট্রাকের চালানের কাগজপত্র দেখতে চাইলে সটকে পড়েন চালক ও হেলপার। পরবর্তীতে গুদাম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে একটি চালান ফরমের মাধ্যমে চালগুলো খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় রুদ্রকর ইউনিয়নের ‘মানিক মাহমুদ খাদ্য বান্ধব’ নামের ডিলারের নামে বরাদ্দকৃত ২৪ মেট্রিক টন চালের অংশ হিসেবে দাবি করে। তবে ঘটনাস্থলেই ওই ডিলারের মালিক এ চাল তার নয় বলে স্বীকার করলে পুরো বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
মানিক মাহমুদ খাদ্য বান্ধবের ডিলার বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘আমাকে গোডাউন থেকে ফোন করে হেলাল ভাই তার সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরে আমি এখানে আসি। আমার কোনো দোষ নেই। আমার চাল আমার গোডাউনে চলে গেছে। এই চাল সম্পর্কে আমি জানি না। এটা আমার চাল নয়।’
বিষয়টি অধিকতর পরিষ্কার হওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। তবে ৫ ঘণ্টা পার হলেও তারা কেউ ঘটনাস্থলে এসে ব্যবস্থা নেয়নি। পরে সন্ধ্যার দিকে পুলিশ ট্রাকসহ চালগুলো থানার গেটে দাঁড় করিয়ে রাখে। পুনরায় সেই একই চালান ফরম থানায় জমা দিয়ে চালগুলো আবার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায় একটি মহল। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে আবারও সেই চাল চৌরঙ্গী এলাকায় আটকে দেয় স্থানীয় জনতা।
প্রকৃত মালিক ও যাচাই-বাছাই ছাড়া থানা থেকে কীভাবে ট্রাকসহ চাল বের হলো বিষয়টি জানতে যোগাযোগ করা হয় পালং মডেল থানায়। দায়িত্বে থাকা থানার উপ-পরিদর্শক আসাদুজ্জামান বলেন, মানিক মাহমুদ খাদ্য বান্ধবের ডিলারের ম্যানেজার আরমান আলী নামের একজন কাগজ নিয়ে এসেছিলেন। পরে উপজেলা খাদ্য অফিসার এসে সঠিক বলায় আমরা চাল ছেড়ে দিয়েছি।
জানা যায়, দুপুরে যে ডিলারের মালিক এ চাল তার নয় দাবি করেছিল সেই একই ডিও লেটারকে বৈধ বানিয়ে চাল ছাড়িয়ে নেয় খাদ্য অধিদপ্তরের একটি অসাধু চক্র। এদিকে ঘটনার পরও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চালের বৈধতা যাচাই বা কোনো দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপের তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে রাত ১২টার নাগাদ চৌরঙ্গী এলাকায় এসে ট্রাকসহ চালগুলো গুদামে নেওয়ার চেষ্টা চালায় সদর উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহনেওয়াজ আলম। পরবর্তীতে তিনিও স্থানীয়দের বাঁধার মুখে পড়েন। পরে তিনিও চলে যান। যদিও মধ্যরাতে সুকৌশলে ট্রাকসহচালগুলো খাদ্যগুদামে নিয়ে যাওয়া হয়।
ইমরান আল নাজির নামের এক ব্যক্তি বলেন, বেলা ১২টা বাজে চাল আটকের পর রাতেও প্রশাসনের কেউ এসে বলেনি এই চাল সরকারের। তারা কেউ দায়িত্ব নেয়নি। তাহলে এই চাল পুলিশের কাছ থেকে কিসের বিনিময়ে কারা এসে নিয়ে যাচ্ছে? তাহলে প্রশাসনের নিম্নস্তর থেকে উপরমহল পর্যন্ত এটার সঙ্গে জড়িত? জনগণ ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা চাল আটকে রেখেছে ডিসি সাহেব জানার পরেও কেন আসলেন না? কেন সে তার দপ্তরের কাউকে পাঠালেন না।
মহিউদ্দিন বেপারী নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দিনের বেলা চাল আটক করা হয়েছে, প্রশাসনের কেউ আসেনি। অথচ রাতের আধারে থানা থেকে চালসহ সেই গাড়ি কীভাবে বের করা হলো আমরা জানতে চাই। তদন্ত করা হলে সব বের হয়ে আসবে।
বিষয়টি নিয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা চালগুলো জব্দ করে নিয়ে এসেছি। ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখানে অনিয়ম রয়েছে কি-না তা তদন্ত করা হবে। এটাও তদন্ত করে দেখা হবে এটা খাদ্যবান্ধব চাল নাকি অন্যকিছু। যদি কেউ নিয়ম বহির্ভূতভাবে এ চাল বের করে থাকে তাহলে এ ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে গত দুই দিন অন্তত ৪ বার জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমকে ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিধান মজুমদার অনি/এমএন/এমএস