আলীকদমে অবাধে বন উজাড়, কমছে বন্যপ্রাণী
• কাটা গাছ পরিবহন করতে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তা
• অস্তিত্ব সংকটে হরিণ-শূকর-ভাল্লুকসহ বন্যপ্রাণী
• প্রাকৃতিক বনের অর্ধেক গাছই কেটে ফেলা হয়েছে
বান্দরবানের আলীকদম-থানচি সীমান্তবর্তী দুর্গম চৈক্ষ্যং এলাকায় প্রায় ২০০ একরজুড়ে চলছে বন উজাড়ের মচ্ছব। এতে হুমকিতে পড়েছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে হরিণ, শূকর, ভাল্লুক, বনমোরগসহ বন্যপ্রাণী। বন উজাড় ঠেকাতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় রয়েছে প্রশাসন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া ,আদুই পাড়াসহ আশপাশের বন এলাকার গর্জন, চাম্পা ফুল, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি, চাপালিশসহ বিলুপ্তপ্রায় নানা প্রজাতির বৃক্ষসহ অন্তত ২০০ একরজুড়ে বন উজাড় করে চলেছে আলীকদম পান বাজার এলাকার ইসমাইল ওরফে লাল ইসমাইল ও লংলেইন ম্রোসহ একাধিক বনখেকো চক্র।
কাটা গাছ পরিবহন করতে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তা। ভরাট করা হয়েছে একাধিক ঝিরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্টকে পাশ কাটিয়ে কলার ঝিরি নামের বাইপাস রাস্তা ব্যবহার করে এসব বৃক্ষ নিয়মিত পাচার করা হচ্ছে আলীকদমসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। কাঠের অবশিষ্ট অংশ আলীকদমের বিভিন্ন অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। বন উজাড়ের ফলে প্রতিনিয়ত চোখে পড়া হরিণ, শূকর, ভাল্লুক, বনমোরগসহ বন্যপ্রাণী এখন বিলুপ্তির পথে।
আলিকদমের ব্যাঙঝিরি এলাকায় কেটে রাখা বিভিন্ন গাছ। ছবি-জাগো নিউজ
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পোলা ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের গাছের গুঁড়ি। এলাকা থেকে দুই বছর ধরে পাড়া প্রাকৃতিক বন থেকে ৩০ জন শ্রমিক দিয়ে মাতৃগাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। এসব গাছের মধ্যে গর্জন, চাম্পা ফুল গাছ, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি গাছ, চাপালিশসহ নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে।
আরও পড়ুন:
‘অসুস্থ হয়ে বন্যহাতির মৃত্যু, পাশে দাঁড়িয়ে শোকে কাতর স্ত্রী হাতি
গ্রামে ফিরে সাপ পালন, বছরে আয় প্রায় ২ কোটি টাকা
বন বিড়াল প্রকৃতির এক অজানা সহযোদ্ধা
স্থানীয়রা জানান, দুবছর আগেও বনে বড় বড় গাছ ছিল। বনে ভাল্লুক, হরিণ, শূকরসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বিচরণ ছিল। এখন বনও নেই, পশুপাখিও নেই। বনের অনেক গাছ অর্ধেক কেটে ফেলে হয়েছে। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে বনের এই ধ্বংসযজ্ঞ চলছে বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
বনের গাছ কাটছিলেন শ্রমিক শামসুল আলম। আলাপকালে জানা যায়, তিনি ১৯ দিন ধরে এ কাজে যুক্ত রয়েছেন।
ব্যাঙঝিরি খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে গাছ পরিবহনের জন্য পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে/ছবি-জাগো নিউজ
চকরিয়া থেকে আসা আরেক দল শ্রমিক দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরিতে কয়েক মাস ধরে গাছ কাটার কাজ করছেন। শ্রমিকদের টিম লিডার মো. ইসমাইল জানান, তারা আবুহান মো. ইসমাইল সওদাগরের অধীনে কাজ করছেন। প্রতিদিন একটি ট্রাক দিয়ে দুইবার কাঠ পরিবহন করা হয়।
আদুই পাড়ার কারবারি কামপ্লাত ম্রো জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যাঙ ঝিরির পানির ওপর ৭-৮টি পাড়া নির্ভরশীল। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।’
নামচাক পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, ‘দুই বছর আগেও এখানে হরিণ, ভাল্লুক, বন্যশূকর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস ছিল। এখন বনও নেই, প্রাণীও নেই।’
গাছ কাটার করাত হাতে একজন শ্রমিক/ছবি-জাগো নিউজ
একই কথা বলেন পামিয়া পাড়ার মেন চং ম্রো। তার ভাষ্য, ‘আগে ব্যাঙ ঝিরিতে প্রচুর পানি, মাছ ও কাঁকড়া ছিল। এখন পানি শুকিয়ে গেছে। আমরা নিরাপদ পানির চরম সংকটে আছি।’
আরও পড়ুন:
যশোরে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে হনুমান
সংকটে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, নিষ্ক্রিয় বন বিভাগ
সাপ অবমুক্ত-চিকিৎসা করাই মনির হোসেনের কাজ
লুংলেই ম্রো নামের স্থানীয় আরেকজনের ভাষ্যমতে, তার বাবা চাহ্লা ম্রো ৫০ একর বন ৪০ হাজার টাকায় পাঁচ বছরের জন্য ইসমাইল সওদাগরের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। ইসমাইল সাংবাদিক, বনবিভাগ, প্রশাসন—সবকিছু ম্যানেজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। মামলা- মোকদ্দমার অভয় দিয়ে প্রায় ২০০ একর এলাকা থেকে গাছ কাটছেন।
প্রায় পানিশূন্য একটি ঝিরি/ছবি-জাগো নিউজ
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেন আবুহান মো. ইসমাইল। তিনি বলেন, ‘আমি মূলত দোকান করি, গাছ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত না। তবে ওই এলাকা থেকে কিছু লাকড়ি কিনেছি। এগুলো তামাক চুল্লিতে সরবরাহ করা হয়।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।
এসআর/এমএস