লোডশেডিংয়ে কক্সবাজারে পর্যটক খরা

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৩:১২ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

গ্রীষ্মের খরতাপ শুরু হতে না হতেই কক্সবাজারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। অসহনীয় গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের এই সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসায়ী, পর্যটক, এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, দিনের ১২ ঘণ্টায় শহরে বিদ্যুৎ মিলছে প্রায় ৬ ঘণ্টা আর গ্রামে পাওয়া যায় ৪ ঘণ্টারও কম। রাতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। প্রতি দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ গেলে আবার আসে দুই ঘণ্টা পর। বিদ্যুতের অনুপস্থিতিতে জেনারেটরে বিকল্প আলো-বাতাসের ব্যবস্থার কথা থাকলেও জ্বালানি তেল সংকটে সেটাও চলমান রাখা কঠিন হচ্ছে।

কয়লা সংকটের কারণে মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন কম হচ্ছে বলে জানা গেছে। ঠিকমতো বাতাস না মেলায় বিদ্যুৎ কম আসছে খুরুশকুলের বায়ুবিদ্যুৎ থেকেও।

লোডশেডিংয়ে কক্সবাজারে পর্যটক খরা

আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, কক্সবাজারে ৩০-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দেখালেও বাতাসে আদ্রতা বেশি থাকায় গরম অনুভূত হয় বেশি। এ পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।

এ অবস্থায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা-বাণিজ্য বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে ছাড় দিয়েও পর্যটক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে সৈকততীরের হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউসগুলো। তারকা হোটেলগুলোতে উচ্চ হর্স পাওয়ারের জেনারেট থাকলেও কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় চলন্ত লিফট। এতে আতঙ্কে পড়েন হোটেলে অবস্থান করা পর্যটকরা।

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকার নবী হোসেন (৪৫) বলেন, এ সময়টাতে জনকোলাহল কম, রুম ভাড়ায় সাশ্রয় থাকে, এটা মাথায় রেখে পরিবার নিয়ে কক্সবাজার এসেছিলাম। কিন্তু যেভাবে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসা করে ভ্রমণ আনন্দটাই নষ্ট হচ্ছে।

গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আসা রায়হান ফারদিন (৩৯) বলেন, বিদ্যুত চলে গেলে জেনারেটর দিতে দেরি করছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ করা হলে বলে, ডিজেল মিলছে না। গরমে এভাবে থাকা কষ্টকর। দিনের ২টা থেকে রাত ১০টার ভেতর ৪-৫ বার আসা-যাওয়া করেছে বিদ্যুৎ।

লোডশেডিংয়ে কক্সবাজারে পর্যটক খরা

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে আসা রিয়াজ মাহমুদ (৪৩) বলেন, টেকনাফ-ইনানী ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হয়েছি। কক্সবাজার শহরে এসেও একই অবস্থায় পড়ে দুদিন আগেই কক্সবাজার ছাড়ছি।

ঈদগাঁওয়ের ভাদিতলার গৃহিনী তানিয়া আতাউল বলেন, ২৪ ঘণ্টায় সবমিলিয়ে ৮ ঘণ্টাও মেলে না বিদ্যুৎ। যখনই বিদ্যুত মেলে মোবাইল সার্জ দেওয়া, মোটরে পানি তোলাসহ বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সকল কাজগুলো নির্ঘুম থেকেও করে নিতে হয়। এমন ভোগান্তি অতীতে হয়নি।

কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ঈদগাঁও জোনের এজিএম মো. আলমগীর কবির বলেন, ৬২ হাজার ৫০০ গ্রাহকের বিদ্যুতের চাহিদা ১৮-১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু বরাদ্দ মেলে ৮-৯ মেগাওয়াট। সমস্যা নিরসনে এনার্জি সেভিং লাইট, ব্যবহার করে ফ্যান, এসি, রাইছ কুকার, হিটার ব্যবহার পরিহার করা উত্তম। সংকট মোকাবেলায় সবার আন্তরিক হওয়া উচিত।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যাপ্ত ছাড়েও পর্যটক ধরে রাখা যাচ্ছে না। পর্যটক কম হলেও হোটেল সচল রাখতে জেনারেটরে প্রতিদিন ১০০-২০০ লিটার জ্বালানি তেল খরচ হচ্ছে। তারপরও কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

তারকা হোটেল ওশ্যান প্যারাডাইসের ফাইন্যান্স ম্যানেজার মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, প্রয়োজনীয় লিফট ও অন্যান্য সেবা সচল রাখতে কোটি টাকা দামের জেনারেটর চালাতে হয়। ক্ষণে ক্ষণে মেশিন চালাতে গিয়ে নানা পার্টস ক্ষতি হচ্ছে। লোডশেডিং ভোগান্তিতে ডিসকাউন্টেও পর্যটক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

লোডশেডিংয়ে কক্সবাজারে পর্যটক খরা

মেরিন ড্রাইভ-কলাতলী হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, তারকা হোটেলে ছাড়া অন্য হোটেলে জেনারেটর দিয়ে এসি চালানো অসম্ভব। মাঝারি মানের হোটেলগুলোতে আলো ও ফ্যান সচল রাখতে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ লিটার জ্বালানি দরকার। জ্বালানি সংকট ও দাম বৃদ্ধিতে আর্থিক ক্ষতি ক্রমেই বাড়ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গণি বলেন, কক্সবাজার শহর ও হোটেল-মোটেল জোন এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহকের জন্য দৈনিক চাহিদা ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। সরবরাহ মিলছে ৩০-৩৫ মেগাওয়াট। অফিস-আদালত খোলা থাকলে চাহিদা তীব্র হয়। পর্যটন এলাকা বিবেচনায় আমরা লোড ম্যানেজমেন্ট ও মনিটরিং করছি এবং ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।

কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মকবুল আলম জানান, সমিতির আওতায় প্রায় ৫ লাখ ১৯ হাজার গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে পিক আওয়ারে ১৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রতিদিনই ঘাটতি থাকে ৩৫-৫০ মেগাওয়াট।

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, চাহিদা আর সরবরাহের বড় ঘাটতিতে লোডশেডিং বাড়ছে। এতে পর্যটন শিল্পসহ সকল উৎপাদনমুখী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এমএন/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।