গাবুরার টমেটোর বাজার ঘিরে দেড়শ কোটি টাকার বাণিজ্য
• প্রতিদিন সোয়া দুই কোটি টাকার বেচাকেনা
• গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ দাম
• টমেটোর বাজার ঘিরে বেড়েছে কর্মসংস্থান
• গাবুরার টমেটো যাচ্ছে সারাদেশে
উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় টমেটো বাজার দিনাজপুরের সদর উপজেলার গাবুরা বাজারে জমে উঠেছে টমেটো বেচাকেনা। এ বাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি টাকার টমেটো যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। সরকারি হিসেবে টমেটোর মৌসুমে দুই মাস চলবে এ বাজার। এ দুই মাসে শুধু গাবুরা বাজারেই প্রায় দেড়শ কোটি টাকার টমেটো বেচাকেনা হবে।
এবার টমেটোর দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। ৯০০-১১০০ টাকা মণ (২২-২৭ টাকা কেজি) বিক্রি হচ্ছে এসব টমেটো। যা গতবার বিক্রি হয়েছিল ৩০০-৫০০ টাকা (কেজি ৭-১২ টাকা)।
জেলা শহর থেকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে গর্ভেশ্বরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এ বাজার এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ টমেটোর পাইকারি হাট। বাজার ঘুরে দেখা যায়, নদীর তীর থেকে মাস্তান বাজার পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাকা সড়কের দুই পাশে, এমনকি আশপাশের বাড়ির আঙিনায়ও অস্থায়ী আড়ত বসেছে। ভোর থেকেই কৃষকরা ক্ষেত থেকে টমেটো তুলে বড় বড় খাঁচায় করে বাজারে আনছেন। পাইকাররা দর কষাকষির মাধ্যমে তা কিনে নিচ্ছেন।
‘ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শতাধিক পাইকার এ বাজারে ভিড় করছেন। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন জাতের টমেটো বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে প্রতিমণ ৯০০-১১০০ টাকার মধ্যে। এরমধ্যে বিপুল প্লাস ও আনসাল জাতের সরবরাহ বেশি’
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শতাধিক পাইকার এ বাজারে ভিড় করছেন। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন জাতের টমেটো বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে প্রতিমণ ৯০০-১১০০ টাকার মধ্যে। এরমধ্যে বিপুল প্লাস ও আনসাল জাতের সরবরাহ বেশি।
আরও পড়ুন:
টমেটো খাওয়া যাদের জন্য বিপজ্জনক
টমেটোর যত উপকারিতা
টমেটো চাষে দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ চাষিরা
টমেটো ফ্রিজে রাখলেই পচে যায়, সংরক্ষণ করবেন যেভাবে
আড়তগুলোতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। প্রতিটি আড়তে ১০-৩০ জন শ্রমিক টমেটো বাছাই, ক্যারেটে ভরা ও ট্রাকে তোলার কাজে নিয়োজিত। প্রতিদিন এ বাজারে ৫০০-৭০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রতিদিন গড়ে ৬০টি ট্রাকে টমেটো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে বলে জানান সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. রবিউল হাসান।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কখনো কখনো এ সংখ্যা ৭০-৮০ ট্রাকেও পৌঁছে। প্রতি ট্রাকে প্রায় ৫০০ ক্যারেট টমেটো বহন করা হয়। প্রতিটি ক্যারেটে গড়ে ৩০ কেজি টমেটো থাকে। সে হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ কেজি টমেটো সরবরাহ হচ্ছে।’
বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতিকেজি টমেটোর দাম ২৫ টাকা। প্রতিদিন দুই কোটি ২৫ লাখ টাকার টমেটো বেচাকেনা হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দুই মাসে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় দেড়শ কোটি টাকায়।
‘বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতিকেজি টমেটোর দাম ২৫ টাকা। প্রতিদিন দুই কোটি ২৫ লাখ টাকার টমেটো বেচাকেনা হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দুই মাসে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় দেড়শ কোটি টাকায়’
কৃষকরা জানান, আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় উৎপাদিত টমেটো অনেক সময় মাঠেই নষ্ট হয়ে যেতো। কিন্তু এখন সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সহজেই সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে তারা ভালো দাম পাচ্ছেন। টমেটো চাষে আগ্রহও বাড়ছে।

মোয়াজ্জেম হোসেন নামের একজন কৃষক জানান, গতবছর তিনি ৪০০ টাকা মণ টমেটো বিক্রি করেছেন। এবার সেই টমেটো বিক্রি করছেন প্রকারভেদে ৭০০-৯০০ টাকা পর্যন্ত দামে।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভালো দাম পাচ্ছি। এবার ভালো লাভ হবে। আমাদের মতো কৃষকদের চাওয়া, এ দাম অব্যাহত থাকুক।’
আরও পড়ুন:
টমেটো চাষে ৫০ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন কৃষকের
বারোমাসি টমেটোয় ১০ গুণ লাভ
টমেটো এক বছর পর্যন্ত ভালো রাখবেন যেভাবে
শরীয়তপুর থেকে আসা টমেটো ব্যবসায়ী দবির সরদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবার টমেটোর দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। কিন্তু আমরা ব্যবসায়ীরা লাভবান হতে পারছি না।’
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বেশি দামে টমেটো কিনতে হচ্ছে। গাড়ি ভাড়াও বেশি পড়ছে। তবে খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না। অনেক সময় টমেটো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
‘ভালো দাম পাচ্ছি। এবার ভালো লাভ হবে। আমাদের মতো কৃষকদের চাওয়া, এ দাম অব্যাহত থাকুক’—টমেটো চাষি
ক্যারেট (টমেটো বহনে ব্যবহৃত) ব্যবসায়ী মো. আফজাল হোসেন জানান, গাবুরা বাজারে টমেটোর মৌমুমে প্রতিদিন দুই থেকে তিন লাখ টাকার ক্যারেট বেচাকেনা হয়। সে হিসেবে দুই মাসে এ বাজারে প্রায় দুই কোটি টাকার ক্যারেট বেচাকেনা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় এক হাজার ১০৮ হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ হয়েছে।উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা হেক্টর প্রতি ৪১.৬৪ মেট্রিক টন। সদর উপজেলা ছাড়াও চিরিরবন্দর ও বীরগঞ্জ, বিরল, খানসামা ও পার্বতীপুরে টমেটো চাষ হচ্ছে।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) আনিসুজ্জামান জানান, আগাম চাষ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকরা দামও ভালো পাচ্ছেন। আগামীতে টমেটো চাষ আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ‘টমেটো সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শিল্প গড়ে তোলা গেলে টমেটো চাষিরা বেশি লাভবান হতে পারবেন। সেই সঙ্গে ভোক্তারাও মৌসুম শেষেও বাজারে টমেটো পাবেন।’
এসআর/এমএস