বিলুপ্তির শঙ্কা পেরিয়ে গারো পাহাড়ে বাড়ছে বন্যহাতি

মোঃ নাঈম ইসলাম
মোঃ নাঈম ইসলাম মোঃ নাঈম ইসলাম , জেলা প্রতিনিধি শেরপুর
প্রকাশিত: ০৮:২৪ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
গারো পাহাড়ের বালিজুরি এলাকার শাবকসহ বিচরণ করছে বন্যহাতির দল/ ছবি: জাগো নিউজ

দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ও বন্যহাতির দ্বন্দ্বে শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকা ছিল উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। বন্যপ্রাণী গবেষকরা আশঙ্কা করছিলেন, এশিয়ান প্রজাতির হাতি হয়তো ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। তবে সেই শঙ্কার মাঝেই মিলেছে আশার আলো। গত এক বছরে এ এলাকায় প্রায় ২০টি হাতির শাবকের জন্ম হয়েছে। বন বিভাগ ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ায় বনে হাতির প্রজননও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গারো পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে বন্যহাতির আবাস। কিন্তু তাদের নিরবচ্ছিন্ন আবাসে বিঘ্ন ঘটান বনখেকোরা। ৩০ বছর ধরে তারা পাহাড়ে অনুপ্রবেশ করে বসতি স্থাপন করেন। এরপর থেকেই ক্রমশ কমেছে গারো পাহাড়ের গহিন বনের পরিমাণ। ফলে হাতির দল মাঝেমধ্যেই খাবারের সন্ধানে গহিন বন থেকে বেরিয়ে আসে। আর তখনই বনের জমিতে বাস করা লোকজনের সঙ্গে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। আবার স্থানীয় কৃষকরা ফসল বাঁচাতে তাদের জমির চারপাশে বিদ্যুতের তার দিয়ে রাখেন যেন ফসলের ক্ষতি করতে না পারে। এতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় বন্যহাতি। আবার অনেক সময় লোকজন হাতি তাড়াতে গিয়ে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে অনেকের মৃত্যুও হয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর শ্রীবরদী উপজেলায় এবং চলতি বছরের ১ নভেম্বর নালিতাবাড়ী উপজেলায় হাতি হত্যার অভিযোগে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী দুটি মামলা হয়। এতে অভিযুক্তরা কারাভোগও করেন। কিন্তু এরপরও বেশকিছু হাতির মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এতে বিগত কয়েক বছর এই অঞ্চলে বন্যহাতির সংখ্যা কমার শঙ্কা তৈরি হয়েছিলো। তবে সম্প্রতি হাতির দলে বেশকিছু শাবক দেখা যাওয়ায় সেই শঙ্কা কাটিয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

‘আমরা জঙ্গলে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে গেলে হাতির দলে শাবক দেখতে পাই। ১৫ থেকে ২০টির মতো শাবক আছে। তবে এতো শাবক একসঙ্গে আমরা আগে কখনো দেখিনি’

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন, আমরা বনের ভিতরে গেলে প্রায়ই হাতির শাবক দেখতে পাই। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫টির বেশি শাবক আমরা দেখেছি।

বিলুপ্তির শঙ্কা পেরিয়ে গারো পাহাড়ে বাড়ছে বন্যহাতি

শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকা/ ছবি: জাগো নিউজ

একই কথা জানান রাঙলী রাণী। তিনি বলেন, আমরা জঙ্গলে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে গেলে হাতির দলে শাবক দেখতে পাই। ১৫ থেকে ২০টির মতো শাবক আছে। তবে এতো শাবক একসঙ্গে আমরা আগে কখনো দেখিনি।

আরও পড়ুন:
তাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট
কালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প

রিসার্চ অ্যান্ড কনজারভেশন অব এলিফ্যান্ট বাংলাদেশের সভাপতি আসিফুজ্জামান পৃথিল জাগো নিউজকে বলেন, দেশের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় একসময় বিরাট এলাকাজুড়ে অবস্থান থাকলেও বর্তমানে সংকুচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে বনবিভাগের শত শত একর জমি দখলদারের দখলে। এক সময় এই পাহাড়ে হাতিসহ নানা জীবজন্তু থাকলেও বন দখল হওয়ায় বিলীন হয়ে গেছে অনেক জীবজন্তু। অবশিষ্ট রয়েছে শুধু হাতি। সেইসব হাতির বিচরণ যেন এখন ঠিক থাকে তাদের চলাচলের রাস্তায় যেন কোন বাধা সৃষ্টি না হয় সেদিকে নজর বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

‘২০২১ সালের ১২ নভেম্বর শ্রীবরদী উপজেলায় এবং চলতি বছরের ১ নভেম্বর নালিতাবাড়ী উপজেলায় হাতি হত্যার অভিযোগে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী দুটি মামলা হয়। এতে অভিযুক্তরা কারাভোগও করে। কিন্তু এরপরও বেশকিছু হাতির মৃত্যু নিয়েও প্রশ্ন ওঠে’

সেভ দ্যা ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড ন্যাচারের (সোয়ান) শেরপুরের যুগ্ম আহ্বায়ক জিহাদুল ইসলাম বলেন, শেরপুরে হাতির সংখ্যা বাড়ছে এটা নিঃসন্দেহে সঠিক তথ্য। চার বছর অন্তর হাতি শাবক প্রসব করে। এখানের কয়েকটি দলে আমরা হাতি শাবককে বিচরণ করতে দেখেছি। তবে পাহাড়ি এলাকায় মানববসতি গড়ে ওঠায় খাবার ও চলাচলের মারাত্মক সংকটে রয়েছে হাতি। ফলে তারা উন্মত্ত হচ্ছে। বিকল্প কোনো জায়গা না পেয়ে গারো পাহাড়েই তাদের স্থায়ী আবাস গড়ছে এবং প্রজননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করছে।

বিলুপ্তির শঙ্কা পেরিয়ে গারো পাহাড়ে বাড়ছে বন্যহাতি

শাবকসহ গারো পাহাড়ের বিচরণ করছে বন্যহাতির দল/ ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, বনের জমিতে অবৈধ বসতিদের বাড়িতে কিভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয় তা আমাদের বোধগম্য নয়। বনবিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে আমাদের দাবি, তারা যেন গারো পাহাড়ের গহিন বনে বিদ্যুৎ সংযোগ না দেয়।

‘শেরপুরে হাতির সংখ্যা বাড়ছে—এটা নিঃসন্দেহে সঠিক তথ্য। চার বছর অন্তর হাতি শাবক প্রসব করে। এখানের কয়েকটি দলে আমরা হাতি শাবককে বিচরণ করতে দেখেছি। তবে পাহাড়ি এলাকায় মানববসতি গড়ে ওঠায় খাবার ও চলাচলের মারাত্মক সংকটে রয়েছে হাতি। ফলে তারা উন্মত্ত হচ্ছে। বিকল্প কোনো জায়গা না পেয়ে গারো পাহাড়েই তাদের স্থায়ী আবাস গড়ছে এবং প্রজননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করছে’

শেরপুরের বন বিভাগের বালিজুরি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার সুমন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের রেঞ্জে গত এক বছরে ১৫টির মতো হাতি শাবক প্রসব হয়েছে। শাবকগুলো সুস্থ আছে। বনবিভাগ শাবকগুলোকে নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছে।

আরও পড়ুন:
রূপগঞ্জে বিদ্যুতের ‘লুকোচুরি’, উৎপাদন সংকটে ২ হাজার কলকারখানা
বাঁশ-বেতের শিল্পে পাহাড়ের প্রাণ, টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম লাকি চাকমার
বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ
পরীক্ষার আগে বিদ্যুৎ সংকটে দিশাহারা এসএসসি পরীক্ষার্থীরা
ছাদবাগান থেকে শুরু, চাঁদপুরে এখন আঙুর চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

তিনি বলেন, আমরা বনবিভাগের পক্ষ হতে হাতির খাবারের জন্য বাগান করেছি। যেখানে চাপালিশ, কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, কাঁঠাল, করমচা, পেয়ারা, আমলকী, কদম, নিম, সোনালু, অর্জুন, পলাশ, কাঞ্চন, শিলকড়ই, ধানছড়া, কানাইডিঙ্গা, তেঁতুল, চিকরাশি, জলপাই, গর্জন, গামার, পেয়ারা, কাজুবাদাম, মহুয়া, বহেরা, হরিতকী, জগডুমুর, ডেউয়া, শেওড়া, চালতা, বেল, আচারগোলা, মহুমাডাল, দুধখড়ি, আতাফল, মহিম্মুড়ি, বাঁশ, ঢাকিজাম, পুতিজাম, বন আমড়া, রেইন্ট্রি, রঞ্জনা, মাহুন্দা, কুম্ভি, বট, বরই, নাগেশ্বর, আম, তেঁতুল, বাজনা, চালতা, হোচা, ছাতিয়ান, লটকন, কামরাঙ্গা, জারুল, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, ইত্যাদি গাছ রোপণ করা হয়েছে।

বিলুপ্তির শঙ্কা পেরিয়ে গারো পাহাড়ে বাড়ছে বন্যহাতি

‘আমাদের রেঞ্জে গত এক বছরে ১৫টির মতো হাতি শাবক প্রসব হয়েছে। শাবকগুলো সুস্থ আছে। বনবিভাগ শাবকগুলোকে নিয়মিত নজরদারিতে রেখেছে’

সুমন মিয়া বলেন, স্থানীয়দের প্রতি আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করেছি, তারা যেন হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের বিব্রত না করে। তাছাড়া হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে বন্যহাতির আক্রমণে নিহত ব্যক্তির পরিবারের জন্য তিন লাখ, আহতকে এক লাখ এবং ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।

এমএনআইএম/এনএইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।