কালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ
নদ-নদী যেমন একদিকে জীবন-জীবিকার আশীর্বাদ, তেমনি অন্যদিকে নির্মম অভিশাপ হবিগঞ্জবাসীর জন্য। প্রতি বর্ষায় খোয়াই, কুশিয়ারা, কালনীসহ নদীগুলোর ভয়াল গ্রাসে ভেঙে যাচ্ছে গ্রাম, বাজার ও স্বপ্ন। নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে হাজারো পরিবার, হারিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা ও জনপদ।
নদীভাঙনের এই ভয়াবহতায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কাকাইলছেও ইউনিয়নের অন্তত ১২টি গ্রাম। কালনী ও কুশিয়ারার অব্যাহত ভাঙনে এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে অসংখ্য বাড়িঘর, মসজিদ, মাদরাসা ও মন্দির। এতে প্রায় চার হাজার পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
একই চিত্র বানিয়াচং, নবীগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায়। বানিয়াচংয়ের পাহাড়পুর, সাতগাঁও, পিরিজপুর ও মার্কুলি বাজারসহ আশপাশের গ্রাম এবং নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রাম নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলুপ্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে বসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়।
‘কালনী কুশিয়ারা নদীটি আগে যখন ভেঙেছে তখন খুব ধীর গতিতে ভেঙেছে। সম্প্রতি খুব দ্রুত ভাঙছে। মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনেই প্রায় ৩০ হাত জায়গা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। এ গতি যদি চলমান থাকে তাহলে কিছু দিনের মধ্যেই সাহানগর গ্রামটি মানচিত্র থেকে মুছে যাবে’
জানা যায়, হাওর, বাওড়, পাহাড় ও টিলাবেষ্টিত হবিগঞ্জ জেলা দিয়ে বয়ে গেছে অর্ধশতাধিক নদ-নদী। নদীগুলো একদিকে যেমন জেলাবাসীর জন্য আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও। এসব নদ-নদী কৃষি খাতকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি নদীভাঙনে অসংখ্য বাড়িঘর, গ্রাম, হাটবাজার, মসজিদ, মাদরাসা, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কাকাইলছেও ইউনিয়নের কালনী-কুশিয়ারা নদী তীরবর্তী গ্রামগুলো। উপজেলার সাহানগর, সৌলরী, বদরপুর, নজরাকান্দা, মনিপুর, জয়নগর, কন্যাজুরী, রুদ্রনগরসহ অন্তত ১২ গ্রামের প্রাচীন মসজিদ, মাদরাসা, মন্দিরসহ প্রায় ৪ হাজার পরিবারের ভিটাবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য।

নদীভাঙনে বিলুপ্তির পথে প্রাচীন জনপদ/ ছবি: জাগো নিউজ
এদিকে প্রতিনিয়ত নদীর ভাঙন বাড়লেও কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তারা জানান, নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে ক্রমেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে হাওরের জীববৈচিত্র, প্রকৃতি, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি। নদী পাড়ের মানুষগুলোকে প্রতিনিয়তই আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। দ্রুত নদী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীরভাঙনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
আরও পড়ুন
তাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
ধানের বাম্পার ফলনেও হাওরজুড়ে হতাশা, খরচের টাকা উঠছে না কৃষকের
পশু বেচাকেনায় শত বছরের পুরোনো প্রথা বদলে দিচ্ছে ‘লাইভ ওয়েট’
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কাকাইলছেও ইউনিয়নের সৌলরি গ্রামের বাসিন্দা শেখ মহিদ মিয়া বলেন, বহু বছর ধরে আমার বংশের সদস্যরা এখানে বসবাস করছে। আমরা গরিব, তেমন জায়গা জমিও নেই। বাড়িও সামান্য জায়গায়। এ অংশটুকুও যদি নদীভাঙনে চলে যায় তাহলে গাছতলায় থাকতে হবে। অন্য কোথাও জমি কিনতে পারবো এমন সামর্থ্যও নেই। বসতভিটা এখন যে অবস্থানে আছে- যেকোনো সময় নদীতে চলে যেতে পারে।
‘নদীভাঙন অব্যাহত থাকলে ক্রমেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে হাওরের জীববৈচিত্র, প্রকৃতি, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি। নদী পাড়ের মানুষগুলোকে প্রতিনিয়তই আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে। দ্রুত নদী ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীরভাঙনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে’
আরেক বাসিন্দা এনামুল হক চৌধুরী বলেন, আমাদের গ্রাম কয়েকশ বছরের পুরোনো। সৌলরি, সাহানগরসহ প্রায় ১০টি গ্রাম অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে গ্রামগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
‘৫ কিলোমিটার এলাকায় নদী ভাঙনরোধে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে আজমিরীগঞ্জের ৪টি স্থানে স্থায়ী নদী ভাঙনরোধ বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন। দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করা হবে। সৌলরি বাজার, নিখলির ঢালা, সাতগাঁও এবং পিরিজপুর এ ৪টি স্থানে ৫ কিলোমিটার ২শ’ মিটার দৈর্ঘ্যের স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন করা হবে’
রাহেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক লিটন চন্দ্র রায় বলেন, কালনী কুশিয়ারা নদীটি আগে যখন ভেঙেছে তখন খুব ধীর গতিতে ভেঙেছে। সম্প্রতি খুব দ্রুত ভাঙছে। মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনেই প্রায় ৩০ হাত জায়গা নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। এ গতি যদি চলমান থাকে তাহলে কিছু দিনের মধ্যেই সাহানগর গ্রামটি মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।

কুশিয়ারার নদী ভেঙনে বিলীন হচ্ছে গ্রাম/ ছবি: জাগো নিউজ
সাহানগর গ্রামের বাসিন্দা দেবরাজ রায় চৌধুরী বলেন, বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনেছি তাদের দাদারাও এই গ্রামে বসবাস করেছে। সেই হিসেবে বলা যায় এটি প্রাচীন একটি গ্রাম। এর আগেও এখানে নদীভাঙন হয়েছে তবে প্রায় ২ সপ্তাহ ধরে যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, যদি এখনই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে হয়ত আরও ২ সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের গ্রামটি বিলীন হয়ে যাবে।
আরও পড়ুন
সংকট-অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে সরকারি মৎস্য হ্যাচারি
ডিজেলে কৃষকের খরচ বাড়বে দেড় হাজার কোটি টাকা
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল মেকারদের জীবিকায় টান
ছাদবাগান থেকে শুরু, চাঁদপুরে এখন আঙুর চাষে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
নজরাকান্দা গ্রামের বাসিন্দা মৎস্য ব্যবসায়ী সঞ্জব আলী বলেন, মাছ ধরে জীবিকা চালাই। যেভাবে নদী ভাঙতে শুরু করেছে আমরা কীভাবে থাকবো।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এস. এম. রেজাউল করিম বলেন, সম্প্রতি নদীভাঙন শুরু হওয়ার বিষয়টি শুনতে পেরেই হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। এরপর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসে পরিদর্শন করেছেন। ভাঙনরোধে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায় আমরা সে চেষ্টা করছি।
‘আমাদের গ্রাম কয়েকশ বছরের পুরোনো। সৌলরি, সাহানগরসহ প্রায় ১০টি গ্রাম অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে গ্রামগুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে’
তিনি বলেন, নদীভাঙনের ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। তাদের বিষয়ে কী করা যায় তা নিয়েও আমরা কাজ করছি।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ৫ কিলোমিটার এলাকায় নদী ভাঙনরোধে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরইমধ্যে আজমিরীগঞ্জের ৪টি স্থানে স্থায়ী নদী ভাঙনরোধ বাস্তবায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়াধীন।
তিনি আরও বলেন, দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু করা হবে। সৌলরি বাজার, নিখলির ঢালা, সাতগাঁও এবং পিরিজপুর এ ৪টি স্থানে ৫ কিলোমিটার ২শ’ মিটার দৈর্ঘ্যের স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
ইআরকে/এনএইচআর/এফএ/এমএস