অর্ধশত শিশুর মৃত্যু, হাম নয় তবে কী?
রাজশাহী অঞ্চলে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত তিন মাসে অর্ধশত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে নমুনা পরীক্ষায় কোনো শিশুর শরীরেই হামের জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস ল্যাবরেটরিজ (আইপিএস) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এতে করে এসব শিশুর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। প্রকৃত কারণ জানতে এ বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
চলতি বছরের মার্চের শুরু থেকে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় হামের উপসর্গের রোগী বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। এসময় পর্যন্ত প্রায় ৮০০ রোগীকে হামের উপসর্গ ধরে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ব্যাপক সংক্রমণ পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে নমুনা সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য বিভাগ। হাম উপসর্গে এখন পর্যন্ত মারা গেছে অর্ধশত শিশু।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা উপসর্গ অনুযায়ী রোগীদের চিকিৎসা দিয়েছি। নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে। কারণ, হামের উপসর্গ থাকলেও মৃত কোনো শিশুর শরীরেই পরীক্ষায় ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজলস ল্যাবরেটরিজে পরীক্ষা হচ্ছে। পজিটিভ যেসব রোগী পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আমরা হাম বলে বিবেচনা করছি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব রোগী আসছে, সবাইকে আইসোলেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
নাটোর থেকে মেয়েকে চিকিৎসা করাতে আসা মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আমি আগে জানতামই না যে আমার মেয়ের হাম হয়েছে। দুই দিন আগে ডাক্তার জানালেন হামে আক্রান্ত। তখন থেকেই খুব চিন্তায় আছি। আবার শুনছি এখন পর্যন্ত কারও শরীরে হামের জীবাণু পাওয়া যায়নি। তাহলে এত শিশু কীভাবে মারা গেলো? এখন আমি ভয়ে আছি।’
আরও পড়ুন:
২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ জনের মৃত্যু
হামের টিকাদান কর্মসূচিতে ডিএনসিসির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট
গত ছয় বছর হামের ক্যাম্পেইন করা হয়নি: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
রাজশাহীর পুঠিয়া থেকে আসা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ডাক্তাররা একেক সময় একেক কথা বলছেন। কেউ বলছেন হাম, আবার কেউ বলছেন অন্য কোনো সংক্রমণ। এ অনিশ্চয়তার মধ্যে আমরা খুব ভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। আসলে কী হচ্ছে, সেটা স্পষ্ট করে জানানো দরকার।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শাহনাজ পারভিন বলেন, ‘অন্যান্য ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিকের যে কার্যকারিতা, তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে না পারার কারণে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়ায় শিশুগুলো মারা যাচ্ছে কি-না, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। একই সঙ্গে এটি নতুন কোনো ভাইরাসের স্ট্রেইন কি-না বা কোভিড বা আরও কাছাকাছি যে ভাইরাসগুলো রয়েছে, তাদের মিউটেশনের কোনো একটি রূপ কি-না—এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আলোচনা এবং গবেষণা করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি বা দাদি-নানিরা জানেন বা বাসার অভিভাবকরা জানেন, শরীরে র্যাশ হবে, জ্বর হবে, ঠান্ডা-সর্দি হবে, সংক্রমণ হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো যখন হয়, এটাকে আমরা হাম বলে ধরে নিই। কিন্তু এবার আমরা দেখছি এই উপসর্গগুলো থাকলেই তা হাম হচ্ছে, এরকম কোনো নিশ্চয়তা নেই। যখন আমরা রক্ত পরীক্ষা করছি বা থ্রোট সোয়াব দিয়ে আমরা পরীক্ষা করে রিপোর্টটা পাচ্ছি, দেখা যাচ্ছে এখানে হামের জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে না। সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া চিকিৎসা দিলে অনেক সময় প্রকৃত কারণ আড়াল হয়ে যায়। তাই মৃত্যুর সঠিক কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।’
রামেক হাসপাতালের মিডিয়া মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উপসর্গ এক হলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ভিন্ন হতে পারে। বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করা দরকার।’
তিনি বলেন, এতগুলো শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরও মারা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।
মনির হোসেন মাহিন/এসআর/এমএস