অভিভাবকশূন্য দুদক, স্থবির দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম
বর্তমানে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থার চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের সবাই পদত্যাগ করার পর প্রায় দুই মাস হতে চললেও এখনো নতুন কমিশন গঠন হয়নি। ফলে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটি এখন অভিভাবকশূন্য। এই সময়ের মধ্যে হয়নি নতুন কোনো মামলা বা অনুসন্ধান। কয়েকটি অভিযোগপত্র জমা ও মামলার সুপারিশ হলেও তা রয়েছে অনুমোদনের অপেক্ষায়। সব মিলিয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে কার্যক্রম।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রুটিন কাজেই তারা সীমাবদ্ধ থাকছেন। সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিচালক জানান, কর্মকর্তারা কাজ করার জন্য মুখিয়ে আছেন। কিন্তু কমিশন না থাকায় নতুন মামলা করা, অভিযোগপত্র অনুমোদন, সম্পদ ক্রোক কিংবা বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া, কমিশন না থাকার সুযোগ নিচ্ছে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজরা।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়/ছবি: জাগো নিউজ
এ বিষয়ে কথা হলে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুসন্ধান, মামলা, তদন্ত ও অভিযোগপত্র অনুমোদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিশনের সম্মতি প্রয়োজন হয়। দুদকে কমিশন নেই মানে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে অচল করে রাখা হয়েছে।
বিএনপির প্রতিশ্রুতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ
ক্ষমতা গ্রহণের আগে বিএনপি জানিয়েছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। নির্বাচনি ইশতেহারে দলটি বলেছিল, দুর্নীতি দমনে পদ্ধতিগত ও আইনি সংস্কার করা হবে। দুর্নীতির বিষয়ে কোনো আপস করবে না তারা। সমাজের সর্বস্তরে দুষ্টুক্ষতের মতো ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে অনুসন্ধান, মামলা, তদন্ত ও অভিযোগপত্র অনুমোদনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিশনের সম্মতি প্রয়োজন হয়। দুদকে কমিশন নেই মানে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে অচল করে রাখা হয়েছে।- দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম
এদিকে, গত অন্তর্বর্তী সরকার দুদক আইন সংশোধন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। এতে তিনজনের বদলে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠনের বিধান করা হয়। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করেনি। এর ফলে নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া থমকে আছে। দুদক আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেই সময়সীমা এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে। কারণ দুদকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ পদত্যাগ করেন গত ৩ মার্চ।
আরও পড়ুন
দুদকের মামলায় রেকর্ড, ইউনূস সরকারের দেড় বছরে প্রায় এক হাজার মামলা
দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগ
চেয়ারম্যান-কমিশনার না থাকায় ‘ঝিমোচ্ছে’ দুদক, আলোচনায় যারা
যদিও দুদকে এমন অচলাবস্থা নতুন নয়। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুদকের সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পেরেছে। বাকিগুলো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিতে হয়েছে। বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ ও সর্বশেষ আবদুল মোমেন কমিশন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পদত্যাগ করে।
বন্ধ ফাঁদ মামলা ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম
দুদক সূত্র জানায়, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে ফাঁদ মামলার কার্যক্রম। আর ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ আছে এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম। ফাঁদ মামলা ও এনফোর্সমেন্ট বন্ধ থাকায় হাসপাতাল, পাসপোর্ট অফিসসহ নাগরিক সেবাকেন্দ্রে যেতে পারছে না দুদক। এর ফলে বেড়েছে সেবা পাওয়ার ভোগান্তি।
দুদকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও হাফিজ আহসান ফরিদ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করেন/ছবি: সংগৃহীত
এনফোর্সমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গত বছর দেশের অর্ধশতাধিক হাসপাতালে আমরা এনফোর্সমেন্ট অভিযান করেছিলাম। সেখানে রোগীদের ভোগান্তি দেখেছি। অভিযানের পর সঠিক সময়ে চিকিৎসক আসা, রোগীদের মানসম্মত খাবার দেওয়া ও ন্যায্যমূল্যে সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছিল। এনফোর্সমেন্ট অভিযান হয়ে গেলে কিছুদিন ভালো সেবা পেয়ে থাকেন রোগীরা। এজন্য কিছুদিন পরপর এটি হলে দুর্নীতিবাজরা আতঙ্কে থাকে। এখন সেবা খাতগুলোতে এনফোর্সমেন্ট বন্ধ থাকায় নাগরিক ভোগান্তি বেড়েছে। অনেকেই আমাদের কাছে অভিযোগ করছেন।’
১৫ মাসে আমলে নেয় ১৫ হাজার অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব নেওয়া আবদুল মোমেন কমিশন ১৫ মাসে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগ আমলে নেয়। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার মামলা করা হয় দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। এতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুদকের জালে ফেঁসে যায়। একই সময়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়। বছর হিসেবে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ৫৯৪টি মামলা ও ৪১৩টি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে কমিশন না থাকায় নতুন করে এসব কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। এতে দুর্নীতিবাজরা কার্যত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
দুদকের বিদায়ী চেয়ারম্যানের পিএসকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি
অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করবে সরকার
চট্টগ্রাম বন্দরসহ ৩ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক
সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই অচলাবস্থার পেছনে রয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। অন্তর্বর্তী সরকার দুদক আইন সংশোধন করে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠনের বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। একই সঙ্গে সার্চ কমিটির পরিবর্তে সাত সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে কমিশন গঠনের প্রস্তাব আনা হয়। তবে বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশ অনুমোদন করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সংশোধিত আইন বাতিল হলে পুরোনো আইনে কমিশন গঠন করতে হবে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি। এমনকি নতুন কমিশন গঠনের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে সার্চ কমিটিও এখনো গঠন করা হয়নি।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, দুদকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন বাছাই কমিটি গঠনের সুপারিশ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ দ্রুত সংশোধন করে আইন হিসেবে অনুমোদন করতে হবে।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ আছে/ফাইল ছবি
নতুন কমিশন নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু
দুদকে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে কারা আসছেন এ নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বিদেশে অর্থপাচার-সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন বিচারক মোতাহার হোসেন। সে সময় তিনি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান।
দুদকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন বাছাই কমিটি গঠনের সুপারিশ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত পর্যায়ে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ দ্রুত সংশোধন করে আইন হিসেবে অনুমোদন করতে হবে।- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান
দুদক কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর ভাই প্রশাসন ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী, সাবেক আয়কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) ও বর্তমানে ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া এবং সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার আবুল হোসেনের নামও দুদক চেয়ারম্যান বা কমিশনের সদস্য হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
এসএম/একিউএফ