কী অপরাধ আমার?


প্রকাশিত: ০২:১৬ পিএম, ১৭ জুলাই ২০১৬

জন্মদাতার পরিচয় না থাকায় আবুল কাসেমের (১৫) মেলেনি জন্ম সনদ। তাই বন্ধ হয়ে গেছে তার লেখাপড়া। সমাজে নানা ধিক্কার আর বঞ্চনাও নিত্য সঙ্গী তার। তাইতো সন্তান হিসেবে নিজের স্বীকৃতির জন্য জন্মদাতা পিতাকে খুঁজে ফিরছেন মানিকগঞ্জের কিশোর আবুল কাসেম।

মানসিক ভারসাম্যহীন মা আর গ্রামবাসী দেলোয়ার পোদ্দার নামে একজনকে বাবা হিসেবে চিনিয়ে দিলেও, তিনি স্বীকৃতি দিচ্ছেন না। পিতার পরিচয় নিশ্চিত করতে কাসেম নেমেছে এক অভিনব প্রচারণায়। অভিযোগ করেছে আদালতেও। সোমবার (১৮ জুলাই) মাসহ কাশেমকে আদালতে উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়েছে।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার লেমুবাড়ি গ্রামের সোনা মিয়ার বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে বসবাস করে আসছে কাশেম। তার মায়ের নাম সখিনা বেগম। তিনি কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী।

মায়ের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের বিশম্ভরপুর উপজেলার চরহাটি গ্রামে। প্রায় ১৮ বছর আগে যেভাবেই হোক সখিনা বেগম পুটাইল গ্রামে আসেন। এই গ্রামের ছালেহা বেগমের বাড়িতে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। বছর দুয়েক পর জন্ম হয় কাসেমের।

Kashem

ছেলে জন্মের পর তিনি সবাইকে জানিয়েছিলেন, ওই গ্রামের দেলোয়ার পোদ্দার সন্তানের বাবা। বড় হওয়ার পর কাশেমকেও দেলোয়ার পোদ্দারকে বাবা হিসেবে চিনেয়েছেন তার মা।

সরেজমিন পুটাইল গ্রামে গিয়ে কথা হয়, কাসেমের মাকে আশ্রয় দেয়া ছালেহা বেগম, সোনা মিয়া ও বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে। তারা জানান, কাশেমের জন্মের পরই তার মা তাদের দেলোয়ার পোদ্দারের কথা জানিয়েছেন। তিনিই যে কাসেমের জন্মদাতা পিতা এ কথা গ্রামের সবার মুখে মুখে। কিন্তু দেলোয়ার পোদ্দার ও তার পরিবার কখানো তা মেনে নেয়নি।

আবুল কাসেম জানায়, মায়ের মুখে শুনে দেলোয়ারকে একবার তিনি বাবা বলে ডেকেছিলেন। এতে দেলোয়ার ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। পরে তাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে।

কাশেম জানায়, তার মা ভিক্ষা করতেন। যখন যে বাড়িতে আশ্রয় মিলতো সেখানেই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন তিনি। তারপরও লেমুবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাকে ভর্তি করে দেন। ২০১২ সালে এই স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ওঠে সে। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের জন্য কাশেমের কাছে জন্ম নিবন্ধন সনদ চাওয়া হয়।

পুটাইল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কাসেম একটি সনদপত্রও যোগাড় করে। সনদপত্রে বাবার পরিচয় দেয় মায়ের কাছে শোনা দেলোয়ার পোদ্দারের নাম। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই রাস্তা থেকে ডেকে নিয়ে তার সনদপত্র ফিরিয়ে নেন চেয়ারম্যান। কারণ হিসেবে চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল জানান, দেলোয়ার পেদ্দারকে বাবা হিসেবে পরিচয় দিলেও, কাসেমকে তিনি স্বীকার করেননি। এ কারণে জন্মসনদ দেয়া সম্ভব নয়।

জন্ম সনদের কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি কাসেম। এরপর থেকে তার লেখাপড়া বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে সে বাজারে বাজারে খেলনা বিক্রি করে। কাসেমের মামারা তার মাকে গত বছর সুনামগঞ্জে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু কাসেম রয়ে গেছে পুটাইল গ্রামেই। জন্মদাতার পরিচয় জানার জন্য।

কাশেম জানান, ছোট থাকতে বুঝতাম না। কিন্তু এখন লোকজন যখন আমার পরিচয় নিয়ে নানা কথা বলে তখন খুব খারাপ লাগে, কষ্ট হয়।

সম্প্রতি আবুল কাসেম কি অপরাধ আমার ? শিরোনামে লেখা একটি ব্যানার হাতে দাঁড়িয়েছিল মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে। যেখানে জন্ম সনদের অভাবে কাসেমের লেখাপড়া বন্ধ হওয়াসহ বাবার পরিচয় জানা, তার অধিকারের বিষয়টি লেখা ছিল।

কাসেম জানান, সাংবাদিকসহ সমাজের সচেতন মহলের দৃষ্টি আর্কষণ করতেই তিনি ব্যানার হাতে এমন অভিনব প্রচারণায় নামে।

একজনের পরামর্শে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছেও গিয়েছিল আবুল কাসেম। তারা বিষয়টিকে তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

Kashem

কয়েক দিন আগে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে দেলোয়ার পোদ্দারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেছেন আবুল কাসেম। সোমবার(১৮ জুলাই) মাসহ কাসেমকে উপস্থিত হওয়ার কথা বলেছে আদালত। এরই মধ্যে সুনামগঞ্জ থেকে তার মাকে নিয়েও এসেছে কাসেম।

মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী আব্দুল মালেক জাগো নিউজকে জানান, কাশেমের জন্মের কয়েকদিন পর তা মা সখিনা বেগম দেলোয়ার পোদ্দারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করার জন্য তার কাছে এসেছিলেন। অভিযোগ তিনি লিখেও দিয়েছিলেন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এরপর তিনি আর আসেনি।

তিনি জানান, বর্তমানে কাশেম তার বাবার পরিচয়ের জন্য আদালতে অভিযোগ করেছেন। বাবা যদি পরিচয় দিতে স্বীকার না করে, তাহলে কোর্ট সাধারণত ডিএনএ টেস্ট করার নির্দেশ দেন। আর ডিএনএ টেস্ট করলেই, সঠিক বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।

অভিযুক্ত দেলোয়ার পোদ্দার জানান, স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে তার জমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। তারাই কাসেমকে ইন্দন দিয়ে এসব করাচ্ছে। কাসেম তার সন্তান কথাটি পুরোপুরি মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি। বিষয়টি আরো নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও রাজি আছেন তিনি।

মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক রাশিদা ফেরদৌস জানান, কাসেমের বিষয়টি এখন আদালতে গড়িয়েছে। তাই আদালতই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবে। তবে ডিএনএ টেস্টের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে দেলোয়ার পোদ্দার কাসেমের বাবা নাকি অন্য কেউ? কিশোর আবুল কাসেম যদি বাবার পরিচয় নিশ্চিত হতে পারে, তাহলে তার খুব ভালো লাগবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

বি.এম খোরশেদ/এআরএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।