‘ইবার একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি, বাচ্চারা কী খাইবো?
- তলিয়ে গেছে ১৫ হাজার হেক্টর জমি
- প্রতিনিয়ত নদ-নদীর পানি বাড়ছে
- বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপরে কংস নদীর পানি
- হাওরাঞ্চলে অর্ধেক ধানও কাটতে পারেনি কৃষক
৬২ বছর বয়সী হতদরিদ্র দিনমজুর ছয়দুর রহমান। ঋণ নিয়ে এক বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি তার সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। ধান কেটে ঘরে তোলার আগেই বৃষ্টিতে ডুবে গেছে তার ধানক্ষেত।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) নেত্রকোনার মদন উপজেলার উচিতপুর হাওরে ডুবে যাওয়া ধান বুকসমান পানি থেকে কেটে ডাঙায় তুলতে দেখা যায় তাকে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কাটা ধান ত্রিপলে করে টেনে আনছিলেন। মদন-খালিয়াজুরী সড়কের যে স্থানে এসব ধান স্তূপ করে রাখছিলেন, সেটিও ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছিল।
ছয়দুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার নিজের বেশি জমি নেই। যেটুকু জমি আছে তাতে হালচাষ, মেশিন দিয়ে সেচ, সার ও কীটনাশক দিতে প্রচুর খরচ হয়। এই খরচ মেটাতে একটা এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। অনেক কষ্ট করেই ধান চাষ করেছিলাম। প্রথমে কিছুদিন আগে শিলাবৃষ্টি পড়ে প্রায় চার আনা ধান ঝরে গেছে। বর্তমানে পানিতে সব ধান তলিয়ে গেছে। এখন সারা বছর কীভাবে চলবে তা ভেবে রাতে ঘুম আসে না।’
‘নন্দের পেটনা হাওরে আমার প্রায় ৬০ একর জমির ধান পানির তলে। আজই সকালে ঘুম থাইক্কা উইঠ্ঠা দেহি পুরা হাওরডার ধান পানিতে ডুইব্বা গেছে। আর দুই সপ্তাহ সময় দিলেই কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারতাম’—ভুক্তভোগী কৃষক
একই এলাকার কৃষক মুখলেছ মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টিতে ধান নষ্ট না হলে জমি থেকেই আমার পরিবারের ছয় মাসের চালের ব্যবস্থা হয়ে যেত। বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ হতো। এখন যে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটবো তারও কায়দা (উপায়) নেই। একজন শ্রমিক আনতে গেলে ১৫০০ টাকা দিতে হয়। সঙ্গে তিনবেলা খেতে দিতে হয়, বিড়ি কিনে দিতে হয়। সবমিলিয়ে একজন শ্রমিকের পেছনে প্রতিদিন ১৮০০ টাকা খরচ হয়।’
ডুবে যাওয়া ধান কাটতে ব্যস্ত শ্রমিকরা/ছবি-জাগো নিউজ
তিনি বলেন, ‘একজন শ্রমিক দিয়ে একদিন কাজ করাতে হলে তাকে তিন মণের ধানের টাকা দিয়ে দিতে হচ্ছে। তাও মিলছে না শ্রমিক। সবমিলিয়ে যা খরচ করেছিলাম তাও উঠবে না। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করবো, খাবই বা কী?’
আরও পড়ুন:
বৃষ্টি-কৃষকের চোখের জলে একাকার হাওরের ধানের জমি
এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?
বন্যার শঙ্কায় আধা পাকা ধান কাটছেন হাওরপাড়ের চাষিরা
হাওরে বন্যার শঙ্কায় দ্রুত ধান কাটতে মাইকিং
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরাঞ্চলের কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। বন্যার শঙ্কায় অনেকে কষ্ট করে হলেও আধাপাকা ধান ঘরে তুলছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগগুলোর সূত্রে জানা গেছে, এসব এলাকার হাওরাঞ্চলের প্রায় অর্ধেক ধান এখনো কৃষকদের ঘরে ওঠেনি।
স্থানীয় কৃষক, উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার আংশিক এলাকা মূলত হাওরাঞ্চল। হাওরের একমাত্র ফসল বোরোর ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখা ও আচার অনুষ্ঠান। জেলায় ছোট-বড় মোট ১৩৪টি হাওরের মধ্যে খালিয়াজুরিতে রয়েছে ৮৯টি।
‘এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। অনেক কষ্ট করেই ধান চাষ করেছিলাম। প্রথমে কিছুদিন আগে শিলাবৃষ্টি পড়ে প্রায় চার আনা ধান ঝরে গেছে। বর্তমানে পানিতে সব ধান তলিয়ে গেছে। এখন সারা বছর কীভাবে চলবে তা ভেবে রাতে ঘুম আসে না’
আগাম বন্যা থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় এবছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ দেওয়া হয়। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর স্থানীয় কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির রোরো ফসল নির্ভর করে।
‘ইবার একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি’
বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে কলমাকান্দার উদয়পুর গ্রামে দেখা যায়, অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে একা ধান কাটছেন কৃষক আব্দুল জলিল। তিনি জানান, এ ধানের জমি উঁচু। এ ধান সাধারণত সব শেষে তারা কাটেন। কিন্তু এবার আগেই পানি এসে সেই ধান তলিয়ে দিয়েছে। তাই চেষ্টা করছেন যা পারেন কেটে তোলার।
‘হাওরে এখনো সবকটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। তবে খুবই চিন্তায় আছি। কারণ, পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছে। কংসের পানি বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। পানি আরও বেড়ে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে’—পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী
হতাশার সুরে এই কৃষক বলেন, ‘ধান কাটার শ্রমিকও নাই। হাওরের পানিতে মেশিনও চলে না। সব দিক দিয়ে আমরা বিপদে পড়ছি। ইবার (এবার) একমুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি, বাচ্চারা কী খাইবো?’
স্তূপ করে রাখা ভেজা ধানে চারা গজিয়েছে। ছবি-জাগো নিউজ
আরও পড়ুন:
হাওরে জলাবদ্ধতায় ভরা মৌসুমেও সংকটে কৃষক
‘পানিতে ডুবে কাঁচা ধান চোখের সামনে পচে যাচ্ছে, চিন্তায় ঘুম হয় না’
আগাম বন্যার ঝুঁকি, হাওরে বোরো নিয়ে শঙ্কা
কলমাকান্দার বড়কাপন এলাকার কৃষক মফিজ মিয়া। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় তার প্রায় এক একর ধানক্ষেত ভেসে থাকতে দেখেছিলেন। গতকাল ধান কাটবেন বলে শ্রমিক ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু সকালে দেখেন, তার সব ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পরে ধান আর কাটা হয়নি।
পানি বাড়ছেই, আরও ক্ষতির শঙ্কা
নেত্রকোনায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কংস নদ, সোমেশ্বরী ও মগড়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খালিয়াজুরির ধনু, কলমাকান্দার উব্দাখালি ও মহাদেও নদ–নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। অব্যাহত বৃষ্টিতে কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি ও মদন উপজেলার বেশ কয়েকটি হাওরে নতুন করে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর ধানক্ষেত তলিয়ে যাচ্ছে।
খালিয়াজুরির জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক ওয়াসিম মিয়া বলেন, ‘নন্দের পেটনা হাওরে আমার প্রায় ৬০ একর জমির ধান পানির তলে। আজই সকালে ঘুম থাইক্কা উইঠ্ঠা দেহি পুরা হাওরডার ধান পানিতে ডুইব্বা গেছে। আর দুই সপ্তাহ সময় দিলেই কৃষকেরা ধান ঘরে তুলতে পারতাম।’
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাওরে এখনো সবকটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। তবে খুবই চিন্তায় আছি। কারণ, পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছে। কংসের পানি বিপৎসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। পানি আরও বেড়ে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।’
ডুবে যাওয়া ধান কেটে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। ছবি-জাগো নিউজ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। আমরা বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলেছি। ইউএনওরা মাঠে আছেন। তাদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে জিও ব্যাগ ফেলার দরকার, সেখানে তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পানি বাড়লে ঝুঁকি বাড়বে, সে ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
এসআর/এএসএম