সুরমা খনন না করেও প্রতিরক্ষা বাঁধ দিয়ে জলাবদ্ধতা ঠেকাবে সিসিক

আহমেদ জামিল
আহমেদ জামিল আহমেদ জামিল , জেলা প্রতিনিধি সিলেট
প্রকাশিত: ০৯:৩০ পিএম, ০১ মে ২০২৬
সুরমা খনন না করেও নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন/ছবি-সংগৃহীত
  • শনিবার মেগা এ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা
  • দুই তীরে ১৫ কিলোমিটার এলাকায় দেওয়া হবে প্রতিরক্ষা বাঁধ
  • সুরমার সঙ্গে যুক্ত হওয়া তিনটি খালের মুখে দেওয়া হবে স্লুইসগেট
  • পকেট খালগুলো খননের চেয়ে এ প্রকল্প অধিক টেকসই হবে ধারণা

সিলেটে বন্যা এখন প্রায় নিয়মিত দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টি আর উজানের ঢল নামলেই প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ডুবে যায় সিলেট নগরীও। এ পরিস্থিতিতে বারবারই আলোচনায় উঠে আসে সুরমা নদীর কথা। প্রশ্ন ওঠে সুরমা খনন নিয়ে।

আলোচনা-সমালোচনা ও কথার ফুলঝুড়ির মধ্যেই চলে যায় বন্যা। ভেস্তে যায় সুরমা খননের উদ্যোগ। ফের বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলে বন্যা-ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আবার সেই সুরমার ঘাড়েই দোষ চাপানো হয়। এভাবেই নিজের ঘাড়ে দোষ নিয়ে ছুটে চলছে প্রমত্তা সুরমা।

তবে এবার সুরমা খনন না করলেও নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। চার হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সুরমার দুই তীরে ১৫ কিলোমিটার এলাকায় দেওয়া হবে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ। তাছাড়া সুরমার সঙ্গে যুক্ত হওয়া তিনটি খালের মুখে দেওয়া হবে স্লুইসগেট। নগরীর ভেতরে জলাবদ্ধতার পানি সুরমা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য স্লুইসগেটে বসানো হবে তিনটি রেগুলেটর ও পাম্প স্টেশন।

‘খালগুলো যতই খনন করেন না কেন, সেগুলো খুব সামান্য পানি বহন করতে পারবে। তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ পানি সুরমা নদীতে আসে। সুরমার দুই পাড় উঁচু করা ছাড়া এ মুহূর্তে বিকল্প কিছু নেই। দক্ষিণ সুরমার পানি সাধারণত কুশিয়ারা নদীর দিকে গড়িয়ে যায়। পাড় উঁচু না করলে সেই পানি উপচে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে’—সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী

শনিবার (২ মে) সিলেট সফরে এসে এ মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরই মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

সিসিক বলছে, মেগা এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সিলেট নগরী বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত পাবে। এরইমধ্যে প্রকল্পটির এলাকা পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাতও।

সুরমা নদী ও নদীর ‘পকেট’ হিসেবে চিহ্নিত খালগুলো খননের চেয়ে এ প্রকল্প অধিক টেকসই হবে বলেও মনে করছেন সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আলী আকবর।

তিনি বলেন, ‌‘খালগুলো যতই খনন করেন না কেন, সেগুলো খুব সামান্য পানি বহন করতে পারবে। তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ পানি সুরমা নদীতে আসে। সুরমার দুই পাড় উঁচু করা ছাড়া এ মুহূর্তে বিকল্প কিছু নেই। দক্ষিণ সুরমার পানি সাধারণত কুশিয়ারা নদীর দিকে গড়িয়ে যায়। পাড় উঁচু না করলে সেই পানি উপচে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।’

সিসিকের এ প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘সিলেট সিটিকে জলাবদ্ধতা ও বন্যা থেকে রক্ষা করতে আমরা অনেক স্টাডি করেছি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতকে বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরিয়ে দেখিয়েছি। তিনি মতামত দিয়েছেন যে, এটিই সবচেয়ে ভালো পথ। তবে রেগুলেটর বসানোর সময় খালের মুখ যেন ছোট না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে বলেছেন এই পানি বিশেষজ্ঞ।’

‘চার হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য দিক হলো ১৫ কিলোমিটার এলাকায় নদীর তীর একেবারে উঁচু করা। যেখানে জায়গা পাওয়া যাবে সেখানে উঁচু করা হবে। আর যেখানে বসতি আছে সেখানে ছোট করে ফ্লাড ওয়াল করে উঁচু করে দেওয়া হবে’

২৪৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সুরমা নদী ভারতের বরাক থেকে উৎপন্ন হয়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জ পেরিয়ে মেঘনায় মিশেছে। পথে অর্ধশতাধিক নদী ও ছড়া এতে যুক্ত হওয়ায় বর্ষায় নদীটির ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু সেই পানি ধারণ ও সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এখন অনেকটাই কমে গেছে।

আরও পড়ুন:
‘অরক্ষিত’ বাঁধে ভয়াবহ ঝুঁকিতে সিলেট
যে কারণে বারবার হিংস্র হচ্ছে সুরমা
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফর শনিবার, উৎসবের আমেজে বৃষ্টির বাগড়া
ভারী বর্ষণে সিলেট অঞ্চলে বন্যার শঙ্কা
পলি পড়ে মরতে বসেছে সুনামগঞ্জের ১০৬ নদী

সুরমার ওপর চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো শাখা নদী ও খালগুলো। তবে বাসিয়া, খাজাংচি ও মৌলভীখালের মতো জলপথ এখন প্রায় অচল। দীর্ঘদিন খনন না হওয়া, দখল এবং স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে এসব জলপথ মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

অবশ্য শনিবার সিলেট সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাসিয়া নদীর পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করবেন। এতে সুরমার চাপ অনেকাংশে কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘সুরমা নদীর পানি যাতে নগরীর ভেতরে ঢুকে প্লাবিত করতে না পারে, সেজন্য সংযোগ খালের মুখে স্লুইসগেট এবং পাম্প স্টেশন তৈরি করা হবে। দুই তীর ধরে যেখানে সরকারি খালি জায়গা আছে, সেখানে ফুটকোর্ট, ছোট পার্ক এবং ওয়াকওয়ে তৈরি করা হবে’

সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আলী আকবর বলেন, ‘চার হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য দিক হলো ১৫ কিলোমিটার এলাকায় নদীর তীর একেবারে উঁচু করা। যেখানে জায়গা পাওয়া যাবে সেখানে উঁচু করা হবে। আর যেখানে বসতি আছে সেখানে ছোট করে ফ্লাড ওয়াল করে উঁচু করে দেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সুরমা নদীর পানি যাতে নগরীর ভেতরে ঢুকে প্লাবিত করতে না পারে, সেজন্য সংযোগ খালের মুখে স্লুইসগেট এবং পাম্প স্টেশন তৈরি করা হবে। দুই তীর ধরে যেখানে সরকারি খালি জায়গা আছে, সেখানে ফুটকোর্ট, ছোট পার্ক এবং ওয়াকওয়ে তৈরি করা হবে।’

সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এমন কাজ করা, যাতে মানুষের বিনোদনের জন্য আর অন্য কোথাও যাওয়া না লাগে। এছাড়া সুরমা নদীর চরগুলো আমরা কেটে দেবো। পাশাপাশি কিছু ওয়াটার রাইড দেওয়া হবে, যাতে মানুষ সহজে যাতায়াত করতে পারে।’

বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ হলে শহরে নদীর পানি ঢুকতে পারবে না। কিন্তু ভেতরের পাহাড় বা টিলা থেকে যে বৃষ্টির পানি আসবে, সেটা দিয়ে এলাকা প্লাবিত হতে পারে। তখন ভেতরের পানিকে সুরমা নদীতে ফেলার জন্য পাম্প কাজ করবে বলে জানান আলী আকবর।

তিনি বলেন, পানির লেভেল একটি নির্দিষ্ট সীমা পার হলে পাম্পগুলো অটোমেটিকলি চালু হবে। পানি কমে গেলে বন্ধ হয়ে যাবে।

এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।