প্রশাসন ‘ম্যানেজড’, নিশ্চিহ্নের পথে চর-কৃষিজমি

আনোয়ার আল শামীম আনোয়ার আল শামীম , জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ০৬:০৯ পিএম, ০৩ মে ২০২৬
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের হাতিয়াদহ এলাকা থেকে তোলা হচ্ছে বালু/ছবি-জাগো নিউজ

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে করতোয়া নদীর বিভিন্ন এলাকায় চর ও কৃষি জমির মাটি কেটে বিক্রি করছে একটি চক্র। মাটির সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে বালু। বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন মাঝেমধ্যে লোক দেখানো অভিযান চালালেও থেমে থাকে না চর ও কৃষি জমির মাটি কাটা।

অভিযুক্তদের দাবি, প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই তারা এসব কর্মকাণ্ড করছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের হাতিয়াদহ এলাকায় ইউপি সদস্য মামুনের নেতৃত্বে করতোয়া নদীতে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন ও তিন ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। এতে ওই এলাকার অন্তত ৩০০ বিঘা কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে কাটাখালী ব্রিজের পূর্ব এবং পশ্চিম পাশে চাঁন মিয়া ও রকি মিয়ার নেতৃত্বে কৃষিজমির মাটি কেটে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ। পৌর শহরের বর্জ্যশোধনাগার ও ৩৩ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক খুঁটি ঘেঁষে বোয়ালিয়া গ্রামের পলাশ মিয়ার নেতৃত্বে চলছে বালু উত্তোলন। ফলে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বর্জ্যশোধনাগারটি হুমকির মুখে পড়েছে।

প্রশাসন ‘ম্যানেজড’, নিশ্চিহ্নের পথে চর-কৃষিজমিকৃষিজমিতে কাটা হচ্ছে মাটি। ছবি-জাগো নিউজ

স্থানীয় মোস্তাফিজুর রহমান দুলুর নেতৃত্বে চলছে কৃষিজমির মাটি কেটে বিক্রির মচ্ছব। সাপমারা ইউনিয়নের চক রহিমাপুর উত্তরপাড়া এলাকায় শাহ আলম কৃষিজমির মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে।

রাখালবুরুজ ইউনিয়নের বড়দহ সেতু এলাকার ৮০০ মিটার দূরে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নিকটবর্তী ভারী ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু ও বিশপুকুর এলাকায় বালু উত্তোলন করে বিক্রি করা হচ্ছে।

‘প্রশাসনতো কখনোই এদিকে আসে না। তবে আপনারা (সাংবাদিক) যখন প্রশাসনকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করেন, তখন তারা বাধ্য হয়ে অভিযান পরিচালনা করেন’—মাটি ব্যবসায়ী

উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ মেরী ও ফকিরগঞ্জ নরেঙ্গবাদ, কাটাবাড়ী ইউনিয়নের পলুপাড়া, ফুলহার, রাখালবুরুজ ইউনিয়নের ধর্মপুর বড়দহ ব্রিজ এলাকা ও মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাসহ করতোয়া নদীর চর কেটে বিক্রি করে আসছে মাটিখেকোরা। তারা অবাধে মাটি কেটে বিক্রি করলেও তা যেন দেখার কেউ নেই।

আরও পড়ুন:
ইটভাটার ধোঁয়ায় নষ্ট দুইশো বিঘা জমির ধান
লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন, কৃষিতে হাহাকার
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল মেকারদের জীবিকায় টান
চাকা ঘোরে কিন্তু ভাগ্য ফেরে না মৃৎশিল্পীদের
‘তেলের পেছনে ছুটবো নাকি কৃষিকাজ করবো?’

স্থানীয়রা জানান, ডাম্প ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে ভারী মাটি পরিবহনের কারণে গ্রামীণ রাস্তা দেবে গিয়ে খানা-খন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সড়কে যানবাহনসহ সাধারণ মানুষের চলাচলে চরম ভোগান্তি হচ্ছে।

প্রশাসন ‘ম্যানেজড’, নিশ্চিহ্নের পথে চর-কৃষিজমিগোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের চক রহিমাপুর উত্তর এলাকায় নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ছবি-জাগো নিউজ

উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের মাটি ব্যবসায়ী মো. এনামুল জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘প্রশাসনতো কখনোই এদিকে আসে না। তবে আপনারা যখন প্রশাসনকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করেন, তখন তারা বাধ্য হয়ে অভিযান পরিচালনা করেন।’

এ বিষয়ে ফুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মামুন বলেন, ‘আমার নামে নিউজ করতে পারেন। কোনো সমস্যা নেই। সবাইকে ম্যানেজ করে এসব কর্মকাণ্ড চলছে।’

‘বালু-মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত আছে। আপনারা (সাংবাদিক) আপনাদের কাজ করেন। আমরা আমাদের কাজ করছি’—ইউএনও

আরেক মাটি ব্যবসায়ী পলাশ মিয়া বলেন, প্রশাসন কোনো সমস্যা করে না। শুধু আপনাদের (সাংবাদিকদের) সমস্যা হয়। প্রশাসন বিষয়টি জানে।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক এমএ মতিন মোল্লা বলেন, ‘খোলা পরিবহনে রাস্তায় পড়ে মাটি ধুলাবালির সৃষ্টি হয়। এতে পরিবেশের বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের সর্দি-কাশিসহ নানা রোগবালাই লেগে থাকছে। গ্রামীণ সড়কে ভারী মাটি পরিবহনে রাস্তা-ঘাট দেবে গিয়ে ফেটে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’

প্রশাসন ‘ম্যানেজড’, নিশ্চিহ্নের পথে চর-কৃষিজমিগোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের হাতিয়াদহ এলাকা থেকে বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। ছবি-জাগো নিউজ

অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘পুলিশকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে কোথাও এ ধরনের কর্মকাণ্ড চললে আমাদের জানালে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, ‘বালু-মাটি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত আছে। আপনারা আপনাদের কাজ করেন। আমরা আমাদের কাজ করছি।’

এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।