থামছেই না লোকসান, অস্তিত্ব সংকটে নর্থ বেঙ্গল ও নাটোর সুগার মিল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নাটোর
প্রকাশিত: ০৮:২৩ পিএম, ০৩ মে ২০২৬
নাটোরের রাষ্ট্রায়ত্ত দুই চিনিকল নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল ও নাটোর সুগার মিল

আখ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার কারণে ধারাবাহিক লোকসানের মধ্যে রয়েছে নাটোরের রাষ্ট্রায়ত্ত দুই চিনিকল নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল ও নাটোর সুগার মিল। লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতকোটি টাকারও বেশি। চলতি বছর আখ চাষ কিছুটা কমে যাওয়ায় এ দুই মিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল গত মৌসুমে এক লাখ ৭২ হাজার ৯৪১ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করে। তবে আখের ঘাটতি ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মিলটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।

মিল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক মৌসুম ধরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল ধারাবাহিকভাবে লোকসানে রয়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হওয়ায় মোট লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। ফলে মিলটির আর্থিক ভারসাম্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

নাটোর সুগার মিলও একই ধরনের সংকটে রয়েছে। আখের স্বল্প সরবরাহ, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে চিনির কম লাভজনক দামের কারণে মিলটি কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন অর্জন করতে পারছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ মিলটিও দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে লোকসান করছে। প্রতি মৌসুমে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় আয় কম থাকায় মিলটির লোকসানের পরিমাণও কয়েক কোটি টাকার ঘরে রয়েছে। এতে করে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় চাপ বাড়ছে।

নাটোর চিনিকল গত আখ মাড়াই মৌসুমে ৯৫ হাজার ১৫০ টন আখ মাড়াই করে পাঁচ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করে। অথচ এক লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে পাঁচ হাজার ৯৩০ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল মিলটি।

‘আখ চাষে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। আবার যখন টাকার প্রয়োজন হয়, তখন ইচ্ছামতো মেরে (ফসল তুলে) সরবরাহ করা যায় না। মূলত মিলের অব্যবস্থাপনা, সময়মতো টাকা পরিশোধ না করা এবং বাইরের তুলনায় দাম কম পাওয়ায় মিলে আখ সরবরাহ কমে গেছে’—চাষি

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুল ইসলাম ভূ্ঁইয়া জানান, ‌মিলের আওতাধীন এলাকায় গত গতবছর ১৮ হাজার ৭১ জমিতে আখের চাষ হয়েছিল। চলতি বছর ১৭ হাজার ৮৫৮ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ মৌসুমে মিলটি ২১ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে আট কোটি টাকা লাভ করে। তবে আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং সুদের টাকা জোগান দিতে গিয়ে মিলটি লোকসানে পড়েছে।

নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের পাশে নাটোর সুগার মিল এবং ঘুঘুরিয়াম সুগার মিল থাকায় তারা নর্থ বেঙ্গল চিনিকল এলাকা থেকে আখ কিনছেন। ফলে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে আখের সরবরাহ কমে গেছে। এতে চিনি উৎপাদনে কম হচ্ছে বলে জানান ফরিদুল ইসলাম।

তবে তিনি নিশ্চিত করে বলেন, চলতি বছর উচ্চ ফলনশীল জাতের আখের আবাদসহ কৃষকদের মধ্যে সার বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ করা হয়েছে। আশা করছেন, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল খুব শিগগির লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবে।

নাটোর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখলাছুর রহমান জানান, চলতি বছর নাটোর সুগার মিল জোন এলাকায় সাত হাজার ২৫০ একর জমিতে আখ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ৭৫০ একর কম।

আরও পড়ুন:
রেকর্ড মুনাফার আড়ালে শুভঙ্করের ফাঁকি, ১০ হাজার বিঘা জমির দাম ৫ লাখ!
বন্ধ চিনিকলে মাসে ব্যয় ২৪ লাখ টাকা
বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ
বন্ধ চিনিকল চালু করা নিয়ে ‘দোটানা’
চিনিকলে ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ যুক্তরাজ্যের

তিনি বলেন, ‘নাটোর মিল জোন এলাকায় উঁচু জমিগুলোতে উচ্চ ফলনশীল জাতের নানা ধরনের ফসল উৎপাদন হচ্ছে। সেগুলো আখের চেয়ে লাভজনক। এজন্য কৃষকরা আখের আবাদ করছেন না।

নিচু এলাকার জমিতে আখ চাষ করা হচ্ছে। এসব জমিতে আখের উৎপাদন কম হয় এবং চিনির পরিমাণ কমে যায়। এ কারণে নাটোর মিল লোকসান করছে বলে মনে করেন এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

‘চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে চাষিদের সঙ্গে বঞ্চনা করছে। শুধু তাই নয়, উন্নত জাতের আখের অভাবে চাষিদের লোকসান হচ্ছে। মূলত অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে চাষিরা অনেকটাই আখ চাষে বিমুখ হয়ে পড়েছেন’—কৃষিবিদ

তিনি বলেন, আখ চাষ বাড়াতে মিল কর্তৃপক্ষ বীজ ও সার সহায়তা, স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা, আখের ক্রয়মূল্য সমন্বয়, সংগ্রহ কেন্দ্র সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও আখ সরবরাহে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।

আখচাষি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুগার মিল দুটির আধুনিকায়ন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে দুই চিনিকলের লোকসানের ধারা অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতে আখের উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

নাটোরের একজন আখচাষি মক্তিমুদ্দিন। মিলের লোকসান প্রসঙ্গে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আখ চাষে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। আবার যখন টাকার প্রয়োজন হয়, তখন ইচ্ছামতো মেরে (ফসল তুলে) সরবরাহ করা যায় না। মূলত মিলের অব্যবস্থাপনা, সময়মতো টাকা পরিশোধ না করা এবং বাইরের তুলনায় দাম কম পাওয়ায় মিলে আখ সরবরাহ কমে গেছে।’

রমজান আলী নামের আরেক চাষির ভাষ্য, ‘আখের চেয়ে অন্যান্য ফসল লাভজনক। এজন্য কৃষকরা ধীরে ধীরে অন্যান্য চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে আখ চাষ অনেকটাই কমে গেছে।’

স্থানীয় কৃষিবিদ ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‌‘চিনিকলগুলো দীর্ঘদিন ধরে চাষিদের সঙ্গে বঞ্চনা করছে। শুধু তাই নয়, উন্নত জাতের আখের অভাবে চাষিদের লোকসান হচ্ছে। মূলত অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে চাষিরা অনেকটাই আখ চাষে বিমুখ হয়ে পড়েছেন।’

রেজাউল করিম রেজা/এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।