মৌলভীবাজার

আধুনিক যন্ত্রে বদলেছে ভাগ্য, এক ফসলি জমি এখন সারা বছরের শস্যভাণ্ডার

মাহিদুল ইসলাম মাহিদুল ইসলাম , জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৯:৩৫ পিএম, ০৩ মে ২০২৬
পরিত্যক্ত জমিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ফল-সবজির বাগান/ছবি: জাগো নিউজ

সবুজের রাজ্য খ্যাত মৌলভীবাজারে কৃষিতে ঘটেছে নীরব বিপ্লব। গত পাঁচ বছরে এ জেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং কৃষকদের সদিচ্ছায় সমতল থেকে পাহাড়ি উঁচু এলাকা— জেলার সবখানেই এখন শোভা পাচ্ছে মৌসুমি ফল ও সবজি বাগান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক সময় শ্রমিক সংকট এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে জেলার হাজার হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকতো। আগে লাঙল-জোয়াল দিয়ে চাষাবাদ করায় সব জমি আবাদের আওতায় আনা সম্ভব হতো না। কিন্তু যান্ত্রিকীকরণের ফলে সেই চিত্র বদলে গেছে। পতিত জমির মালিকরা এখন চাষ করছেন অথবা লিজ দিচ্ছেন। এমনকি ভাগাভাগি বা অর্ধেক ফসলের চুক্তিতেও এসব জমি চাষাবাদ হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ হাজার হেক্টর পতিত জমি চাষাবাদ আওতায় আসছে।

কৃষকরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে কৃষিতে ব্যাপকভাবে যন্ত্রের ব্যবহার হওয়ায় সহজেই চাষাবাদ করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার পাশাপাশি এক ফসিল জমিকে দুই বা তিন ফসলিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

আধুনিক যন্ত্রে বদলেছে ভাগ্য, এক ফসলি জমি এখন সারা বছরের শস্যভাণ্ডার

দেখা গেছে, ৫ থেকে ৭ বছর আগেও যেসব জমি পতিত ছিল, বর্তমানে সেসব জমির মূল্য ও গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। সমতল ও উঁচু উভয় এলাকায় পতিত জমিতে আম, আনারস, লেবু, মাল্টা, পেয়ারা, কাঁঠাল, কুল, পেঁপে ও বেগুনের মতো মৌসুমি ফল ও সবজির বাগান গড়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন
প্রশাসন ‘ম্যানেজড’, নিশ্চিহ্নের পথে চর-কৃষিজমি
মেহেরপুরে ৮০০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ, বাম্পার ফলনের আশা
এক সময়ের আশীর্বাদ কমলা নদী এখন কৃষকের জন্য ‘অভিশাপ’
ভালো দামেও লোকসানের মুখে মিষ্টি কুমড়া চাষিরা

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৩ হাজার ৭২০ হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার হেক্টরে। যা গত ৫ বছরে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে।

‘যান্ত্রিকীকরণের ফলে পতিত জমির মালিকরা এখন চাষ করছেন অথবা লিজ দিচ্ছেন। এমনকি ভাগাভাগি বা অর্ধেক ফসলের চুক্তিতেও এসব জমি চাষাবাদ হচ্ছে’

সরেজমিনে বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন এলাকায় সময় যত যাচ্ছে, ততই পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আসছে। পাঁচ বছর আগেও যেসব জমি জঙ্গল বা পরিত্যক্ত ছিল, সেখানে এখন সবজি ও ফলের বাগান শোভা পাচ্ছে। আগে যেসব জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল হতো, সেগুলোতে এখন উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে দুই থেকে তিনটি ফসল ফলানো হচ্ছে।

জয়নাল মিয়া, হেলাল আহমদ ও রুকন উদ্দিনসহ কয়েকজন চাষি জানান, আগে বাড়ির আশপাশে বা নিচু এলাকার অনেক জমি পরিত্যক্ত পড়ে থাকত। গত কয়েক বছর ধরে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির সহায়তায় এসব জমিতে অনায়াসেই ফসল ফলানো যাচ্ছে। কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও উৎপাদিত ফসল সারা বছর ভালো দামে বিক্রি করা যায়। যার ফলে অনেকে কৃষিকে এখন পেশা হিসেবে নিচ্ছেন।

আধুনিক যন্ত্রে বদলেছে ভাগ্য, এক ফসলি জমি এখন সারা বছরের শস্যভাণ্ডার

কৃষি উদ্যোক্তা আজাদুর রহমান বলেন, প্রায় ৬ একর জায়গা লিজ নিয়ে বাগান করেছি। এ জায়গা একসময় পতিত জমি ছিল। এখানে প্রথমে ঈগল নার্সারি অ্যান্ড ফ্লাওয়ার গার্ডেন করেছি। তারপর বরই, লাউ, পেঁপেসহ বিভিন্ন সবজি বাগান করেছি। বছরে সব খরচ বাদে এখান থেকে প্রায় ৮-১০ লাখ টাকা আয় হয়। যখন এই জমি লিজ নিয়েছিলাম তখন জঙ্গল ছিল। অথচ এখন এ জায়গাকে সবাই বরই বাগান নামে চিনে।

‘প্রতি বছর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ হেক্টর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আসছে। বিশেষ করে আনারস, মাল্টা, লেবুসহ বিভিন্ন বাগান করা হচ্ছে’

কমলগঞ্জের কৃষক রাজু আহমেদ বলেন, আগে শুধু শীতকালে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ চাষ করতাম। এখন সারা বছর এসব সবজি উৎপাদন করি। অসময়ে ফসল পেতে শুধু সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে হয়। এতে করে আগে যে জমিতে বছরে একবার চাষ হতো, এখন সেই জমিতে তিনবার ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে।

আধুনিক যন্ত্রে বদলেছে ভাগ্য, এক ফসলি জমি এখন সারা বছরের শস্যভাণ্ডার

আরও পড়ুন
সাতক্ষীরার উপকূলে লবণাক্ত জমিতে ভুট্টা চাষে সাফল্য
তীব্র খরায় ঝরছে লিচুর গুটি, শঙ্কায় চাষিরা

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, প্রতি বছর প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ হেক্টর পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আসছে। বিশেষ করে আনারস, মাল্টা, লেবুসহ বিভিন্ন বাগান করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনেকেই লাউ, পেঁপে, কলাসহ বিভিন্ন সবজি বাগানও করছেন।

তিনি বলেন, যত সময় যাবে পতিত জমি তত চাষাবাদের আওতায় আসবে। হয়ত এসব জমি দুই বা তিন ফসলি নয় তবুও কৃষি জমি হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে এ জেলার একেকটি অঞ্চল একেকটি ফল বা সবজির জন্য সুপরিচিত। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় টমেটো, ফুলকপি, বাধাকপি, পেঁপে, আনারস, কাঠালসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হয়।

কেএইচকে/এএইচ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।