জনমদুখী আনোয়ারার খাবার-ওষুধের খরচ চলে ইট ভেঙে

উপজেলা প্রতিনিধি
উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশিত: ১০:৩৮ এএম, ০৭ মে ২০২৬

চোখে মুখে ক্লান্তি আর কাঁপা কাঁপা হাতে লোহার হাতুড়ি দিয়ে একের পর এক ইট টুকরো করছেন। এরপর ওই টুকরো ইটগুলোকে বস্তায় ভরে সারিবদ্ধভাবে নিজের পাশে সাজিয়ে রাখছেন। হাঁপিয়ে গেলে একটু থেমে আবারও কাজ করছেন। কারণ উপার্জন হলেই খাবার আর ওষুধ মিলবে ৭৫ বছর বয়সি আনোয়ারা বেগমের।

স্বামী-সন্তানহারা জীবনে জীবিকার তাগিদে বৃদ্ধ বয়সেও ইট ভাঙার শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের অসহায় বৃদ্ধ আনোয়ারা। জনমদুখী আনোয়ারার বসতভিটাও গেছে নদীর পেটে। নানা জটিলতায় জাতীয় পরিচয়পত্রও নেই তার। ফলে পান না কোনো প্রকার ভাতা সুবিধা।

আনোয়ারা বেগম নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার মোহাম্মদ ইয়াকুব আলীর মেয়ে। উন্নত জীবনের লক্ষ্যে ২০০১ সালে স্বামী রেফাজ উদ্দিনকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে সিদ্ধিরগঞ্জে এসে বসবাস শুরু করেন। মৃত্যুর আগে স্বামী রেফাজ উদ্দিন দিনমজুরের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সাংসারিক জীবনে তাদের দুজন ছেলে সন্তান জন্ম নিলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুটি সন্তানই মারা যায়। এরপর এক মেয়েকে পালক এনে সন্তানের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা চালান। তবে সেখানেও সুখ মেলেনি বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগমের। তাদের ফুটফুটে সেই পালক মেয়েটিও মৃত্যুবরণ করে।

আনোয়ারা বলেন, প্রায় ১৩ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি একাই জীবনযাপন করছেন। বর্মমানে (নাসিক) ১ নম্বর ওয়ার্ডের মিজমিজি পাইনাদী সংলগ্ন ১০ তলার পেছনে একটি ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর ইট ভাঙাই হয়ে উঠেছে তার জীবিকা।

জনমদুখী আনোয়ারার খাবার-ওষুধের খরচ চলে ইট ভেঙে

নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার জীবন শুরু থেকেই সংগ্রামের। সংসার জীবনে আমার দুটি ছেলে সন্তান জন্ম নিলেও একজনও বেঁচে নেই। ছোট থাকা অবস্থায়ই মারা গেছে। এরপর মাত্র ১৫ দিন বসয়ের একটা মেয়েকে পালক এনে লালনপালনের পর এক বছরের মাথায় মেয়েটাও জ্বরে মারা গেলো। এরপরতো আর সন্তানের সুখ মেলেনি। স্বামীর সঙ্গে ২৫-২৬ বছর আগে ঢাকায় এসে থাকা শুরু করি। উনার (স্বামী) খাদ্যনালীতে সমস্যা হয়ে ১৩ বছর আগে মারা যান। এরপর তার মরদেহ নিয়ে গ্রামে দাফন করে তিনমাস পর আবার এখানে চলে আসি।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাকে দেখার মতো কোনো মানুষ নেই। আমার গ্রামে অল্প কিছু সম্পদ ছিল সেটাও বড় তিস্তা নদী ভেঙে নিয়ে গেছে। আমার স্বামী ২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর আস্তে আস্তে তার খাদ্যনালী শুকিয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যান। ওইসময় অসুস্থতার কারণে আর সংসার খরচ যোগাতে আমি ইট ভাঙার কাজ শুরু করি। এক পর্যায়ে ২০১৩ তিনি সালে মারা যান। এরপর থেকে আমি একাই জীবনযাপন করছি।

আনোয়ারা বেগম বলেন, উনি (স্বামী) মারা যাওয়ার পর প্রথমে এই এলাকাতে একটা খালি জায়গায় ছাপড়া ঘর তুলে আমি বাস করে যাচ্ছিলাম। এরপর বর্তমানে যেখানে থাকি সেই বাড়ির মালিক রব্বানী সাহেব আমাকে তার বাড়ির একটি ঘরে থাকার জায়গা দিয়েছেন। বাড়ির মালিক আমার থেকে কোনো ভাড়া নেন না। বরং উনি প্রতি মাসে খাবারদাবারও কিনে দেয়। আমি ইট ভেঙে সেগুলো বস্তায় ভরলে প্রতি বস্তায় ৫০-৬০ করে পাই। অসুস্থ থাকায় আগের মতো কাজ করতে পারি না। তবু প্রতিদিন ইট ভেঙে যা আয় হয় তা দিয়েই চলে ওষুধ আর খাবারের খরচ। আমি আলসার রোগে অসুস্থ। প্রতিমাসে ৩ হাজার টাকার ওষুধ লাগে আমার।

জনমদুখী আনোয়ারার খাবার-ওষুধের খরচ চলে ইট ভেঙে

নিজের কোনো ভোটার আইডি কার্ড নেই বলে জানিয়ে আনোয়ারা বেগম বলেন, আমি ভোটার হয়েছি এবং সে স্লিপটা আমার বাসা থেকে হারিয়ে গেছে। এরপর আর ভোটার আইডি কার্ড পাইনি। যদি ভোটার আইডি কার্ড থাকতো, বয়স্ক ভাতা অথবা সরকারি কিছু অনুদান পেতাম। আমি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছিলাম। তারা আগারগাঁও যেতে বলে। আমি আগারগাঁও কীভাবে যাবো?

সরকারের কাছে সাহায্য আবেদন করে এই বৃদ্ধা বলেন, আমি আমাদের দেশের সরকারের কাছে সাহায্য চাই। সরকার আমার পাশে দাঁড়ালে আমি কিছুটা ভালো থাকবো। স্বজনহীন আমাকে যদি সরকার সাহায্য করে আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।

স্থানীয় বাসিন্দা সেলিনা বেগমের বসতবাড়িতে ইট ভাঙার কাজ করেন এই বৃদ্ধা। ভবন মালিক সেলিনা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, উনি (আনোয়ারা) অনেক বছর ধরেই দেখি এখানে থাকেন। তাকে আশপাশের মানুষ সাহায্য সহযোগিতা করে। আমরাও তার পাশে থাকার চেষ্টা করি। অসুস্থ মানুষ হওয়ার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তারপরও নিজের খরচ চালানোর জন্য ইট ভাঙেন। আমার বাড়িতে বর্তমানে ইট ভাঙেন। উনাকে সরকার কিংবা বড় মাপের কেউ সহযোগিতা করে না আশপাশের মানুষ ছাড়া।

এ বিষয়ে নাসিকের ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিসের সচিব হজরত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ওই বৃদ্ধাকে আমার সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করিয়ে দিলে আমি তার আইডি কার্ড পাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

মো. আকাশ/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।