২০ হাজার টাকায় ধর্ষণচেষ্টার দফারফা, থানায় জানালে গ্রামছাড়া করার হুমকি
ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক কিশোরীর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সালিশ-বৈঠকে অভিযুক্তকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে দফারফা করার ঘটনা ঘটেছে।
রোববার (৩ মে) দিনগত রাতে উপজেলার হামিরদী ইউনিয়নের মুনসুরাবাদ গুচ্ছগ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার জরিমানার পুরো টাকাও হাতে পায়নি বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সালিশ-বৈঠকে ধর্ষণচেষ্টায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, গোপনে তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায় করেছেন মাতব্বররা। যদিও ভুক্তভোগীর পরিবারকে মাত্র দশ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
ওই কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, সালিশ-বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত না মানলে তাদের গ্রামছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী কিশোরী (১২) স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা পেশায় ভ্যানচালক, মা অসুস্থ। বাবা ও দাদির সঙ্গে সে ওই গুচ্ছগ্রামে থাকে। ওই এলাকার গ্যারেজমিস্ত্রি দেলোয়ারকে (৫৫) কিশোরী দাদা বলে ডাকে।
ভুক্তভোগী কিশোরীর ভাষ্য, তার বাবা অভিযুক্ত ব্যক্তি দেলোয়ারের একটি ভ্যান ভাড়ায় চালান। প্রায়ই ফাঁকা ঘরে ঢুকে তিনি (দেলোয়ার) কুপ্রস্তাব দিতেন। কথা না শুনলে তার (কিশোরী) বাবার কাছ থেকে ভ্যান কেড়ে নেওয়ার হুমকিও দেন। মেয়েটি গত ২৫ এপ্রিল রাতে ঘরে একা ছিল। রাত প্রায় ১০টার দিকে দেলোয়ার সেখানে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। ওই কিশোরীর চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে।
বিষয়টি জানাজানি হলে রোববার দিনগত রাত ৯টার দিকে সালিশ-বৈঠক বসে। এতে হামিরদী ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য (মেম্বার) বাবর আলী মাতুব্বর, মুনসুরাবাদ গুচ্ছ গ্রামের সভাপতি কাশেম আলীসহ অন্য গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা এ ঘটনার জন্য দেলোয়ারকে দায়ী করে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। পরে ওই কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে একটি স্ট্যাম্পে সই রেখে ১০ হাজার টাকা ধরিয়ে দেন তারা। পরবর্তীতে আরও ১০ হাজার টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
মেয়েটির স্বজনের অভিযোগ, সালিশের সিদ্ধান্ত না মানলে, এ বিষয়ে থানা-পুলিশ বা বাড়াবাড়ি করলে তাদের এলাকাছাড়া করার হুমকি দেন মাতব্বররা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি জানান, মাতব্বরেরা প্রকাশ্যে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করলেও গোপনে দেলোয়ারের কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায় করেছেন। এ নিয়ে পুরো এলাকায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
ভুক্তভোগী কিশোরীর দাদি বলেন, মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। কীভাবে তার বিয়ে দেবেন, এ নিয়েই সব চিন্তা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত দেলোয়ার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, আমাকে ফাঁসানো হয়েছে, আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। আমি এ ঘটনার সাথে জড়িত নই। আমি এর বিচার চাই।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে বাবর আলী মাতুব্বরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি। সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।
মুনসুরাবাদ গুচ্ছ গ্রামের সভাপতি কাসেম আলী বলেন, রোববার রাতে আমরা স্থানীয় লোকজন বসে সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে দেলোয়ারকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে দিয়েছি। তখন কিন্তু এই মেয়েটির দাদি, বাবা, চাচা সবাই উপস্থিত ছিলেন। তখন তারা দরবার মেনে নিয়ে এখন বলছে সালিশ মানি না। এগুলো তো ঠিক নয়।
বিষয়টি নিয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এন কে বি নয়ন/এমএন/এএসএম