রাঙ্গামাটিতে ইসলামী ব্যাংকের আউটলেটে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা মালিক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাঙ্গামাটি
প্রকাশিত: ০২:৩৭ পিএম, ০৯ মে ২০২৬

রাঙ্গামাটির লংগদুতে প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের কয়েক কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মালিক মো. রাসেল। এতে সঞ্চয় হারিয়ে দিশাহারা গ্রাহকরা ভিড় করছেন ব্যাংকের সামনে। তবে যারা বৈধ লেনদেন করেছেন তাদের টাকা ব্যাংকে নিরাপদ আছে বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার (৪ মে) থেকে ব্যাংকে তালা ঝুলিয়ে আত্মগোপন আছেন তিনি। এমনকি তার মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সকল অ্যাকাউন্ট বন্ধ রয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, তারা নিয়মিত ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে রশিদ বুঝে নিতেন। কিন্তু এজেন্ট ব্যাংকের আউটলেটের মালিক সেই টাকা অ্যাকাউন্টে জমা না দিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের কাছে রেখে দিতেন। জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ব্যাংক বন্ধ দেখে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।

গ্রাহকদের সঙ্গে এজেন্ট মো. রাসেলের প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেছেন এজেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তা আমির হোসেন। তিনি বলেন, আমিসহ যারা এখানে কর্মরত ছিলাম সবাই রাসেল ভাইয়ের নির্দেশ পালন করতাম। এতে আমাদের কোনো লাভ ছিল না, এমনকি আমরা নিজেরাও তাকে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছি। মূলত রাসেল ভাই ঋণগ্রস্ত ছিলেন। মাইনীমূখ বাজারে দুটি দোকান ছাড়াও অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহকদের টাকা নিয়ে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসার কাজে ব্যয় করেছেন। গ্রাহকদের অধিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা এফডিআর করার কথা বলে নিয়েছেন। কিন্তু এফডিআর না করে টাকা নিজের ব্যবসার পেছনে বিনিয়োগ করেছেন। এতে গ্রাহকদের লভ্যাংশ দিতে গিয়ে আরও বেশি ঋণগ্রস্ত হতে থাকেন।

আমির হোসেন আরও বলেন, আমি অনেকবার বলেছি গ্রাহকের টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা করার জন্য। কিন্তু তিনি করবেন করবেন বলেও করেননি। এনিয়ে তার সঙ্গে আমার মনোমালিন্য হলে গত রোজা থেকে আমি ব্যাংকে যাওয়া বন্ধ করে দেই। শুনেছি তিনি দোকান ও বাড়ি বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্বজনদের বাধায় সেসব করার সুযোগ পাননি। তবে তিনি গ্রাহকের কোনো টাকা নিয়ে যেতে পারেননি। সব টাকা তিনি বিভিন্ন খাতে ব্যয় করে লস করেছেন। তাই শেষ পর্যন্ত তিনি এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

এজেন্ট ব্যাংকে আমানতকারী ইকবাল হোসেন বলেন, আমরা ব্যাংকে এসে টাকা জমা দিয়েছি, আমাদের কাছে রসিদও আছে। কিন্তু এখন শুনছি, আমাদের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। আমাদের সারা জীবনের সঞ্চয় নিয়ে রাসেল পালিয়ে গেছে।

লংগদু সরকারি মডেল কলেজের প্রভাষক আজগর আলী বলেন, আমার স্ত্রী আমাকে না জানিয়ে ৫ লাখ টাকা জমা রেখেছিল ৩ মাস মেয়াদী এফডিআর করার জন্য। টাকাটা সোনালী ব্যাংক থেকে চেকের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। আমার স্ত্রীকে বলা হয় কয়েকদিনের মধ্যে সকল ডকুমেন্ট দেওয়া হবে। কিন্তু মাস পার হলেও ডকুমেন্ট পায়নি সে। এখনতো মালিক নিজে পালিয়ে গেছে। অনেক খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ বিপাকে ফেলে দিলো। মূলত রাসেলকে সবাই বিশ্বাস করে লেনদেন করেছে। তিনি সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।

এ বিষয়ে মাইনীমূখ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও রাসেলের মামা আবুল কাসেম বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে জানতে পেরেছি যে রাসেল গ্রাহকদের টাকা নিয়ে পালিয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। গ্রাহকদেরকে ধৈর্য ধরতে হবে, আশা করছি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটা সমাধান করবে।’

রাঙ্গামাটি ইসলামী ব্যাংক শাখার ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ নাজমুল হক জানান, এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মালিক মো. রাসেল ব্যক্তিগতভাবে অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত সোমবার থেকে তিনি নিখোঁজ। বর্তমানে ব্যাংকটি বন্ধ রয়েছে। পুরো বিষয়টি আমাদের একটি বিশেষ টিম তদন্ত করছে।

তিনি আরও জানান, ব্যাংকিং নিয়মের মধ্যে থেকে যাদের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে, তাদের আমানত নিরাপদ রয়েছে এবং তারা টাকা ফেরত পাবেন। তবে ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত লেনদেন বা নিয়মবহির্ভূত লেনদেনের দায়ভার ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নেবে না।

এ বিষয়ে লংগদু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকারিয়া জানান, বিষয়টি আমরা অবগত আছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবু দারদা খান আরমান/এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।