বেহাল সড়কে কাটা ধান নিয়ে দুর্ভোগে হাওরের চাষিরা
সুনামগঞ্জে কষ্টের ধান ঘরে তুলতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন হাওরের কৃষকরা। তবে এ বছর উৎপাদিত ধান ঘরে তুলতে একের পর এক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে নাজেহাল এই অঞ্চলের কৃষকদের অবস্থা। অতিবৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাশাপাশি ফসলহানির পর ধান পরিবহনে ডুবন্ত সড়কের বেহাল দশায় কৃষকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
খোজঁ নিয়ে জানা যায়, হাওরের ধান বহনের সড়কগুলোকে স্থানীয়ভাবে জাঙ্গাল, কিংবা গোপাট নামে ডাকেন হাওরের কৃষকরা। তবে বছরের পর বছর হাওরের এই ধান পরিবহনের সড়কগুলো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতে হওয়া কাদায় কাটা ধান খলায় আনতে কৃষকদের সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এমনকি ধান কাটার চেয়ে এখন কৃষকদের জন্য এই ধান খলায় নিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।
টানা কয়েকদিন জেলার বিশ্বম্ভরপুরের খরচার হাওর, সুনামগঞ্জ সদরে দেখার হাওর ও তাহিরপুরের মাটিয়ান ও শানির হাওরে গিয়ে দেখা যায়, সকল হাওরেই রয়েছে ধান কেটে ঘরে আনার অসংখ্য অভ্যন্তরীণ সড়ক। বর্ষা মৌসুমে এসব সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে বিশেষ করে বোরো ধান কাটার সময় এগুলোই কৃষকদের ধান পরিবহনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে অধিকাংশ গোপাট এখন ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। কোনোটি একেবারে ভেঙে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জ দেখার হাওরের কৃষক শামসুল হক বলেন, হাওরের ধান কেটে খলায় আনতে প্রচুর ভোগান্তি হচ্ছে। মূলত হাওরের (জাঙ্গাল) ধান সড়কগুলোর একাধিক স্থানে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সুতরাং এদিকে ধান নিয়ে আসা মারাত্মক কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শনির হাওরের কৃষক মহিম আলী বলেন, টানা বৃষ্টিতে হাওরের ধান নিয়ে (জাঙ্গাল) সড়ক দিয়ে নিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। কারণ এই সড়কগুলো বর্তমানে যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
মাটিয়ান হাওরের কৃষক অসীম তালুকদার বলেন, এই বছর ধান ঘরে তুলতে যে পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে তা অতীতে হয়নি। শুরুতেই হাওরের ধান ট্রলি দিয়ে ধান আনতে পারলেও এখন সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।
করচার হাওরের কৃষক রুহুল আমিন বলেন, গত বছর একদিকে ধান কেটেছি অন্যদিকে ধান খলায় নিয়ে এসে মাড়াই করেছি। কিন্তু এই বছর কোনোও কিছু সম্ভব হচ্ছে না। ধান কেটে সেই ধান খলায় নিয়ে প্রচুর ভোগান্তি হচ্ছে। কেউ টেনে নিচ্ছে কোনোও রকম আবার কেউবা টুকড়ি দিয়ে।
দেখার হাওরের কৃষক জিসান মিয়া বলেন, কৃষকদের সব কিছুতেই ভোগান্তি এই ভোগান্তির শেষ কোথায়। আমরা হাওরের সকল ভোগান্তি থেকে মুক্তি চাই।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে হাওরাঞ্চলে ৮৫ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। জেলায় মোট ধান কাটার হার ৭৭ শতাংশ। তবে বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমি। যদিও কৃষক কিংবা কৃষক সংগঠনের দাবি ৩০ হাজার হেক্টরের উপরে এই ধান নষ্ট হয়েছে।
জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, হাওরের অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়নে আগে একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছিল। এজন্য প্রস্তাবনাও প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই প্রকল্প আর বাস্তবায়নের পর্যায়ে এগোয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো রাস্তা, যা স্থানীয়রা ‘জাঙ্গাল’ নামে ডাকেন। এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে এসব জাঙ্গাল চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারপরও কৃষকরা অনেক কষ্ট করে ধান খলায় নিয়ে আসছেন।
তিনি আরও বলেন, জাঙ্গালগুলো পরিকল্পিতভাবে সাবমারসিবল পাকা সড়কে রূপান্তর করা হলে কৃষকরা সহজে ধান পরিবহন করতে পারবেন ও পরিবহন ব্যয়ও কমে আসবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
লিপসন আহমেদ/এমএন/এমএস