পেঁয়াজের ‘ধলতায়’ পুড়ছে কৃষকের কপাল
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির বৃহত্তম সোনাপুর পেঁয়াজ বাজার। সপ্তাহের রবিবার ও বৃহস্পতিবার দুদিন বসে এই বাজার। সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া বাজারে বেচাকেনা হয় সকাল ১০টা পর্যন্ত। এই দুদিন ভোর থেকে পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে আসতে শুরু করেন চাষিরা। প্রতিহাটে প্রায় কোটি টাকার পেঁয়াজ বেচাকেনা হলেও চাষিদের মধ্যে ‘ধলতার’ নামে চাপা হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করে।
ধলতা হলো এমন এক রীতি, যেখানে প্রতি মণে দেড় কেজি পেঁয়াজ বেশি নেওয়া হয়। ব্যবসায়ী-আড়তদারদের দীর্ঘদিনের এই জুলুমে অতিষ্ঠ পেঁয়াজচাষিরা। বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালেও বালিয়াকান্দির সোনাপুর পেঁয়াজ বাজারে গিয়ে চাষিদের এমন অভিযোগ পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন-
কৃষকদের থেকে ওজনে অতিরিক্ত পণ্য নিলে ব্যবস্থা নেবে সরকার
নাটোরে খরচের টাকাও উঠছে না পেঁয়াজ চাষিদের
কুড়িগ্রামে পেঁয়াজ বীজ উৎপাদন, আশার আলো দেখছেন কৃষকেরা
কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। কালুখালীতে ধলতা নেই, কিন্তু সোনাপুরে নেওয়া হচ্ছে। ধলতা না দিতে তারা আন্দোলন করেও কোনো লাভ হয়নি। মণে আজও দেড় কেজি বেশি দিতে হচ্ছে। আবার বস্তায় কয়েকটি পেঁয়াজ পচা বের হলে কয়েক কেজি বাদ দেওয়া হচ্ছে। ধলতা পুরোপুরি বন্ধ চাই।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রশাসন ও কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে মণে এক থেকে দেড় কেজি বেশি নেওয়া হচ্ছে। এতে কৃষকদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে ধলতা বাদ দিলে সারা দেশেই বাদ দিতে হবে। এক বাজারে থাকবে, আরেক বাজারে থাকবে না— এটা যেন না হয়।
জানা গেছে, সারা দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ পেঁয়াজ উৎপাদন হয় রাজবাড়ীতে। উৎপাদনের দিক দিয়ে জেলার অবস্থান তৃতীয়। জেলার সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয় বালিয়াকান্দি, কালুখালী ও পাংশায়। ফলে এই জেলা থেকে দেশের পেঁয়াজের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হয়।
‘কাঁচামালের ঘাটতি হয়, তাই একটু বেশি নেওয়া হচ্ছে। ধলতা উঠিয়ে দিলে সারাদেশেই ওঠাতে হবে। এক জেলা বা এক হাটে থাকবে, অন্য হাটে থাকবে না- এটা নিয়মের মধ্যে পড়ে না।’
তবে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের ঠকিয়ে মণে ২ থেকে ৩ কেজি, কখনো তারও বেশি পেঁয়াজ নিয়ে আসছে। গত ২৭ এপ্রিল কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নাসির-উল-দৌলা স্বাক্ষরিত পেঁয়াজ ও আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ওজনের অনিয়ম সংক্রান্ত একটি চিঠি জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো হয়। এর প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন রাজবাড়ীর পেঁয়াজের হাটগুলোতে ধলতা বন্ধে প্রচারণা চালায়।
আরও পড়ুন-
এক মণ পেঁয়াজের দামে মিলছে এককেজি গরুর মাংস
রাজশাহীতে রেকর্ড ফলনেও পেঁয়াজ চাষে লোকসান
মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম না পেয়ে মাথায় হাত চাষিদের
উঠছে না উৎপাদন খরচও, পেঁয়াজ চাষিদের দুশ্চিন্তা
এরপরই মঙ্গলবার (৫ মে) জেলার বালিয়াকান্দির বৃহত্তম পেঁয়াজের বাজার সোনাপুর, বহরপুর, জঙ্গলসহ বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ কেনাবেচা বন্ধ রেখে ধর্মঘট শুরু করেন। এসময় কৃষকরা পেঁয়াজ-রসুন বাজারে এনে বিক্রি করতে না পেরে ফেরত নিয়ে যেতে বাধ্য হন। এতে হাট-বাজারগুলোতে ত্রিমুখী উত্তেজনা তৈরি হয়।
একই কারণে বুধবার (৬ মে) সকালে কালুখালী বাজারে পেঁয়াজ কেনাবেচা বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন করেন ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। এসময় বাজারে পেঁয়াজ এনে বিক্রি করতে না পারায় বিপাকে পড়েন কৃষকরা। পরে তারা পেঁয়াজের মণে বাড়তি (ধলতা) বন্ধের দাবিতে কালুখালীতে বিক্ষোভ করেন।

ব্যবসায়ী হারুন খান ও রেজাউল বলেন, প্রশাসন ও কৃষকদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত হয় তারা ৪১ কেজি ৫০০ গ্রাম আনলে ৪০ কেজির দাম পাবেন। কিন্তু তারা আনছেন ৪৬ কেজি ৫০০ গ্রাম, দাম পাচ্ছেন ৪৫ কেজির। কাঁচামালের ঘাটতি হয়, তাই একটু বেশি নেওয়া হচ্ছে। ধলতা উঠিয়ে দিলে সারাদেশেই ওঠাতে হবে। এক জেলা বা এক হাটে থাকবে, অন্য হাটে থাকবে না- এটা নিয়মের মধ্যে পড়ে না। আজ বাজারে ভালো পেঁয়াজ ১ হাজার ২০০ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৬৫০ টাকা মণ বিক্রি হয়েছে।
‘প্রথমে কথা হয়েছিল প্রতি মণে ২০০ গ্রাম বেশি নেওয়ার। কিন্তু আজ হাটে আনার পর এক কেজি ৫০০ গ্রাম বেশি নিচ্ছে। তাহলে আন্দোলন করে লাভ কী হলো? দুই হাট পার হলেই আগের মতো নেওয়া শুরু হয়ে যাবে।’
কৃষক জাকির বলেন, প্রথমে কথা হয়েছিল প্রতি মণে ২০০ গ্রাম বেশি নেওয়ার। কিন্তু আজ হাটে আনার পর এক কেজি ৫০০ গ্রাম বেশি নিচ্ছে। তাহলে আন্দোলন করে লাভ কী হলো? দুই হাট পার হলেই আগের মতো নেওয়া শুরু হয়ে যাবে। প্রশাসন কঠোরভাবে তদারকি করলে ব্যবসায়ীরা মানতে বাধ্য। কিন্তু প্রশাসন হাটে আসে না। তারা ওপর থেকে কথা বলে, মাঠে আসে না।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন বাজার কমিটির সঙ্গে কথা বলে, কৃষকদের সঙ্গে বলে না। কৃষকদের দুর্দশা সারাজীবনের।
আরেক কৃষক আব্দুল মণ্ডল বলেন, গত হাটে আড়তদাররা ঘর বন্ধ রেখেছিল। কোনো পেঁয়াজ কেনেনি। আজ বিক্রি করলাম, সেখানে মণে দেড় কেজি বেশি নিয়েছে। পাশের কালুখালীতে ধলতা নেই, কিন্তু সোনাপুরে নিচ্ছে। আমরা চাই ধলতা উঠে যাক।

কৃষক মনিরউদ্দিন বলেন, ধলতা নেওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু আজও বেশি নিচ্ছে। টাকার প্রয়োজনে বাজারে আমাদের পেঁয়াজ আনতেই হবে। কিন্তু ন্যায্যদাম হয় না।
‘অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি এবং খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে বসে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ৪০ কেজি মানে ৪০ কেজিই।’
সোনাপুর বাজার ব্যবসায়ী বণিক সমিতির সভাপতি খোন্দকার মজিবুর রহমান জানান, জেলার বৃহত্তম বাজারের একটি সোনাপুর বাজার। এখানে প্রতি হাটে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ট্রাক এবং টাকার হিসাবে আনুমানিক প্রায় কোটি টাকার বেশি পেঁয়াজ বেচা-কেনা হয়। পরবর্তীতে এই পেঁয়াজ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। এখানকার পেঁয়াজের মান ভালো হওয়ায় সারাদেশে রাজবাড়ীর পেঁয়াজের চাহিদা অনেক।
বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, গতকাল পেঁয়াজ বেচাকেনা বন্ধ থাকলেও আজ ধলতা ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে পেঁয়াজ বেচাকেনা চলছে। গতকাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কৃষকরা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেখানে উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। ফলে সেখানে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা জানা নেই। তবে বাজার মনিটরিং চলমান আছে এবং ধলতা ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে।
কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, অভিযোগের বিষয়টি শুনেছি এবং খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে বসে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ৪০ কেজি মানে ৪০ কেজিই।
এফএ/এমএস