ইছামতি উদ্ধার প্রকল্পে কাটছাঁট, বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়
পাবনার ঐতিহ্যবাহী ইছামতি নদী পুনরুজ্জীবিত করতে দেড় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু আলোর মুখ দেখতে থাকা এই বিশাল আয়োজন এখন যেন দায়সারা এক কর্মযজ্ঞ। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ মতামতকে তোয়াক্কা না করে প্রকল্পের নকশা থেকে হঠাৎ বাদ দেওয়া হয়েছে নদী প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ১৩টি সেতু পুনর্নির্মাণ ও নৌপথ তৈরির পরিকল্পনা।
তড়িঘড়ি করে নেওয়া এ সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক উদাসীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যথাযথ সংস্কার ছাড়া হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত নদী নয়, স্রেফ একটি বড় নালা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, একসময় ইছামতি নদী দিয়েই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বজরা নৌকা চলতো। কিন্তু গত কয়েক দশকে দখল আর দূষণের কবলে পড়ে নদীটি আজ মৃতপ্রায়। স্থানীয় সরকার বিভাগ, এলজিইডি এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তর চলাচলের সুবিধার কথা বলে নদীর ওপর অসংখ্য নিচু ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল সমীক্ষা চালিয়ে জানিয়েছে, এসব অপরিকল্পিত স্থাপনাই নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের প্রধান বাধা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিশেষজ্ঞদের এমন মতামতের ভিত্তিতে এবং দীর্ঘদিনের জনদাবির মুখে ২০২৩ সালে ইছামতি উদ্ধারে এক হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদি এ প্রকল্পে বলা হয়েছিল, প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী সব কালভার্ট ভেঙে সেখানে আধুনিক ও সুউচ্চ সেতু নির্মাণ করা হবে। একইসঙ্গে নদীকে দখলমুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে একটি নান্দনিক রূপ দেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সেনাবাহিনীর যৌথ তত্ত্বাবধানে নদীটির শহরের অংশের বাইরের কাজ দ্রুত চললেও পাঁচ কিলোমিটার শহর অংশের কাজ মামলা জটিলতায় বারবার থমকে যাচ্ছে।
‘প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার বড় একটি অংশ ছিল শহরের ব্যস্ততম আব্দুল হামিদ রোডের যানজট কমাতে নদীতে বিকল্প নৌপথ তৈরি করা। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে নৌপথের কাজও বাদ দেওয়া হয়েছে সংশোধিত ডিপিপিতে। একনেকে পাস হওয়া একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এমন কাটছাঁট নজিরবিহীন। এতে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য অর্জন হবে না। ব্যর্থ প্রকল্পে পরিণত হবে’
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র সাত দিন আগে। তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের নকশা সংশোধন (আরডিপিপি) করা হয়। রহস্যজনকভাবে নতুন এ নকশা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ১৩টি সেতু পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা। ফলে রূপকথা সড়ক, পৈলানপুর ও নতুন ব্রিজসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো আগের মতোই রয়ে যাচ্ছে, যা নদী উদ্ধারের মূল লক্ষ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

আরও পড়ুন
খাতা-কলমে নদ, বাস্তবে নর্দমা
দখল-দূষণমুক্ত কর্ণফুলী নদীর দাবিতে ‘বিনি সুতার মালা’ কর্মসূচি
১২০০ কোটি টাকা ব্যয় করেও মৃতপ্রায় কুমার নদ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার বড় একটি অংশ ছিল শহরের ব্যস্ততম আব্দুল হামিদ রোডের যানজট কমাতে নদীতে বিকল্প নৌপথ তৈরি করা। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে নৌপথের কাজও বাদ দেওয়া হয়েছে সংশোধিত ডিপিপিতে। একনেকে পাস হওয়া একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এমন কাটছাঁট নজিরবিহীন। এতে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য অর্জন হবে না। ব্যর্থ প্রকল্পে পরিণত হবে।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধক সেতুগুলো রেখে নদী খনন করা মানে হলো একটি ড্রেন বা নালা তৈরি করা, নদী উদ্ধার নয়। প্রবাহ রুদ্ধ থাকলে নদী কখনোই তার যৌবন ফিরে পাবে না। হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প কেবল অপচয়েই পর্যবসিত হবে।’
‘প্রতিবন্ধক সেতুগুলো রেখে নদী খনন করা মানে হলো একটি ড্রেন বা নালা তৈরি করা, নদী উদ্ধার নয়। প্রবাহ রুদ্ধ থাকলে নদী কখনোই তার যৌবন ফিরে পাবে না। হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প কেবল অপচয়েই পর্যবসিত হবে’
এদিকে, তড়িঘড়ি করে করা এই পরিবর্তনকে ‘জনস্বার্থবিরোধী’ উল্লেখ করে অবিলম্বে প্রকল্পটির সংশোধিত ডিপিপি বাতিল ও পূর্বের নকশা অনুযায়ী ব্রিজ নির্মাণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের দাবি জানিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
আরও পড়ুন
আড়াই কিলোমিটার খননের অভাবে আটকে আছে কুমারের হৃৎস্পন্দন
নদীর পর ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ অ্যাওয়ার্ডও দখলে এক্স সিরামিকের!
দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে নন্দকুজা

পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্তমান বিরোধী দলের এক নেতার চাপে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ প্রকল্পটি কাটছাঁট করা হয়েছে। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ মতামতকেও উপেক্ষা করা হয়েছে। আমি এর নিন্দা জানাই। প্রকল্পটি পরিবর্তন না করে প্রথম অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।’
তবে পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক সুধাংশু কুমার সরকার বলছেন ভিন্ন কথা। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, ‘নকশা পরিবর্তনে প্রকল্পের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। এরইমধ্যে ২৬ কিলোমিটার পর্যন্ত খনন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। শহর অংশে সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকায় আমরা আংশিক খনন কাজ করেছি। তবে শহর অংশে মামলা জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা এটি সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
এএইচআইএন/কেএইচকে/এসআর/এমএস