খাতা-কলমে নদ, বাস্তবে নর্দমা

এন কে বি নয়ন এন কে বি নয়ন ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৪:১৮ পিএম, ০৯ মে ২০২৬
পয়ঃবর্জ্যে নর্দমায় পরিণত হয়েছে ফরিদপুরের কুমার নদ/ ছবি: জাগো নিউজ

পৌর এলাকার পয়ঃবর্জ্যের প্রায় ৭০ ভাগই সরাসরি নদে পড়ছে
৩৮ হাজার হোল্ডিংধারী, পানির লাইনের গ্রাহক মাত্র ১০ হাজার
সেপটিক ট্যাংক ৩ থেকে ৫ বছর পরপর পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক

কুমার নদ, ফরিদপুর শহরের মধ্য দিয়ে চলছে এটি। খাতা-কলমে এই নদের নাম থাকলেও বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে পৌরসভার প্রধান বর্জ্য নিষ্কাশনের পথ হিসেবে। পরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় পৌর এলাকার পয়ঃবর্জ্যের প্রায় ৭০ ভাগই সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদে। ফলে এক সময়ের প্রাণবন্ত এই নদ এখন নর্দমায় রূপ নিয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফরিদপুর পৌর এলাকার অধিকাংশ পয়ঃবর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই বিভিন্ন ড্রেন ও নালার মাধ্যমে গিয়ে মিশছে কুমার নদে। বিশেষ করে শহরের বহুতল ভব-বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোর অনেকগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন লাইন সরাসরি ড্রেনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মানববর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা ও ময়লা পানির চাপ বহন করতে হচ্ছে নদটিকে। এতে পানির স্বাভাবিক রং ও গন্ধ হারিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ। ফলে কুমার নদের পানি ব্যবহার এখন অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে নিত্যদিনের কাজেকর্মে চাপ পড়ছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপরে।

অন্যদিকে নিতান্ত বাধ্য হয়ে যারা এই পানি ব্যবহার করছেন, তারাও নানা পানিবাহিত রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছে পরিবেশের জীববৈচিত্র। পাশাপাশি পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশন খাতে পৌরসভার রাজস্ব আয়ও কমে গেছে।

বিষয়টি নিয়ে ইতোপূর্বে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন জড়িতদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই। পৌর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কঠোর অভিযানের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার ফলাফল একেবারে শূন্য।

খাতা-কলমে নদ, বাস্তবে নর্দমা

কুমার নদের অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহার করছেন স্থানীয়রা/ ছবি: জাগো নিউজ

পৌর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এসব অবৈধ পয়ঃবর্জ্য সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে শিগগির কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।

ড্রেন বন্ধ সড়ক অচল, মশা-মাছির উপদ্রবে বিপর্যস্ত পৌরবাসী
ঢাকার খালে টয়লেটের লাইন, পাড়ে নাক চেপে বসবাস
যে উপজেলায় এখনও পৌঁছায়নি চার চাকার যান
আমের মুকুলে আশা, ফলনে হতাশ চাষিরা

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩৮ হাজার নিবন্ধিত হোল্ডিংধারী বসত-বাড়ি ও বিভিন্ন ধরনের অসংখ্যক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে পানির লাইনের গ্রাহক রয়েছেন ১০ হাজারের মতো।

‘আগে এই কমার নদে গোসল করতাম। নদীর পানি দিয়ে বাসা-বাড়ির নানা কাজ এমনকি রান্নাবান্নাতেও ব্যবহার করা হতো। এই নদের পানি দিয়ে অনেকে ওযুও করতেন। কিন্তু এখন এই নদের পানিতে শরীর ভেজালে চুলকানি হয়। বর্তমানে মারাত্মকভাবে এই নদের পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। এই নদটি এখন নর্দমায় পরিণত হয়েছে’

এছাড়া বাসাবাড়ি ও সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য নির্ধারিত লাইন রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার। অথচ এর মধ্যে মাত্র ৩ হাজার বাসা-বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ম অনুযায়ী পৌরসভার মাধ্যমে মল ও বর্জ্য পরিষ্কার করেন। বাকি বড় একটি অংশ অবৈধভাবে ড্রেন ও নালার মাধ্যমে সেফটি ট্যাংকির সংযোগ করে অথবা ভিন্ন পন্থায় বর্জ্য অপসারণ করছে। এই হিসেবে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টন পয়ঃবর্জ্য গিয়ে পড়ছে এই কুমার নদের বুকে। যা দিনের পর দিন জমে নদীর বুকে এক ভয়ংকর দূষণ তৈরি করেছে।

স্যানিটেশন আইন অনুযায়ী, প্রতিটি বাড়ির সেপটিক ট্যাংক প্রতি ৩ থেকে ৫ বছর পর পর পরিষ্কার করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফরিদপুর পৌরসভার চিত্র যেনো তার উল্টো।

পৌরসভা সূত্রে জানায়, আগে যে সব প্রতিষ্ঠান ও বসত-বাড়ি থেকে নিয়মিত বর্জ্য পরিষ্কার করানো হতো, সেসব বাসাবাড়ি কিংবা প্রতিষ্ঠানও বিগত কয়েক বছর ধরে তাদের দিয়ে সেগুলো পরিষ্কার করাচ্ছে না। এমনকি প্রত্যেকে প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে সেফটিক ট্যাংকের পাশাপাশি সোকওয়েল থাকার কথা থাকলেও, নেই অনেকের।

খাতা-কলমে নদ, বাস্তবে নর্দমা

কুমার নদে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে বর্জ্য/ ছবি: জাগো নিউজ

জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বসতবাড়ি ও প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র ৩০টি পরিবার সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করিয়েছে। এ হিসেবে গড়ে প্রতি মাসে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ টি পরিবার এই সেবা গ্রহণ করে। সে হিসাবে এতে মাত্র ৩০ শতাংশ বৈধভাবে পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশন করছে। বাকি বৃহৎ অংশই সরাসরি অবৈধ লাইন দিয়ে ড্রেনে কিংবা আশেপাশের বিকল্প উপায় অবলম্বন করছে।

‘ফরিদপুর শহরের অক্সিজেন ভান্ডার এই কুমার নদের দূষণরোধে কার্যকর উপায় গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি’

ফরিদপুর পৌরসভা পয়ঃনিষ্কাশন ও পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (সিআরপিসি) চালু হওয়ার পর থেকে সেপটিক ট্যাংকের মল পরিষ্কার বাবদ ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর কয়েক লক্ষাধিক টাকা আয় করে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে পৌরসভা থেকে সেবা না নিয়ে অবৈধভাবে ড্রেনের লাইনে বর্জ্য সংযোগ দেওয়ায় এই আয় অনেকটাই কমে গেছে। আর এদের একটি বড় অংশই এই পয়ঃবর্জ্য অসাধু উপায়ে ড্রেনের মাধ্যমে কুমারে ফেলছে। যা গোটা নদীকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে।

আলু এখন ‘গলার কাঁটা’
হারিয়ে যাচ্ছে ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পালগিরি জামে মসজিদ
পরিশ্রান্ত শরীর চায় ঘুম, মশা আর দূষণের সঙ্গে সহাবস্থান তাদের
আধুনিক যন্ত্রে বদলেছে ভাগ্য, এক ফসলি জমি এখন সারা বছরের শস্যভাণ্ডার

এদিকে ইতোপূর্বে কুমার নদের দখল-দূষণ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ময়লা-আবর্জনা ফেলে কুমার নদ দূষিত না করার জন্য বাজার কমিটিকে কঠোর হুঁশিয়ারির পাশাপাশি পৌরসভাকে ড্রেনের পয়বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়। এরপর প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হলেও সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি।

শহরের পূর্ব খাবাসপুর মহল্লার বাসিন্দা আব্দুল হান্নান মিয়া বলেন, আমরা আগে এই কমার নদে গোসল করতাম। নদীর পানি দিয়ে বাসা-বাড়ির নানা কাজ এমনকি রান্নাবান্নাতেও ব্যবহার করা হতো। এই নদের পানি দিয়ে অনেকে ওযুও করতেন। কিন্তু এখন এই নদের পানিতে শরীর ভেজালে চুলকানি হয়। বর্তমানে মারাত্মকভাবে এই নদের পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। এই নদটি এখন নর্দমায় পরিণত হয়েছে।

খাতা-কলমে নদ, বাস্তবে নর্দমা

অবৈধভাবে পয়ঃনিষ্কাশন লাইন নদে সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে/ ছবি: জাগো নিউজ

এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মফিজ ইমাম মিলন বলেন, যারা এই পয়ঃবর্জ্য সরাসরি পৌরসভার ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে ফেলছেন, তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা উচিত। এর সাথে যেসব বাসা-বাড়িতে সেপটিক ট্যাংকের সঙ্গে সোকওয়েল করা হয় না তাদেরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনলে নদের এই দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

‘চলতি মাস থেকেই অবৈধ লাইনগুলো উচ্ছেদের ব্যাপারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেসব বাড়িতে ড্রেনের সঙ্গে পয়ঃবর্জ্যের লাইনের সংযোগ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে’

ফরিদপুর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, ফরিদপুর শহরের অক্সিজেন ভান্ডার এই কুমার নদের দূষণরোধে কার্যকর উপায় গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

ফরিদপুর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন) সৈয়দ মো. আশরাফ জানান, চলতি মাস থেকেই অবৈধ লাইনগুলো উচ্ছেদের ব্যাপারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেসব বাড়িতে ড্রেনের সঙ্গে পয়ঃবর্জ্যের লাইনের সংযোগ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুমার নদে সরাসরি ময়লা-আবর্জনা ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী জাগো নিউজকে বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি। পৌর শহরের যত ময়লা-আর্বজনা ড্রেনের মাধ্যমে নদে যায়। আসলে আমাদের এ আবর্জনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় এমনটি হচ্ছে। তবে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে পৌর শহরের আবর্জনা ও ড্রেনের ময়লা-পানি যেন কুমার নদে না যায় সেজন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হবে।

এনএইচআর/এএইচ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।