পুঁজিহীনদের জীবিকার নতুন পথ যমুনার পানি

আলমগীর হোসাইন আলমগীর হোসাইন , জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৪:১৬ পিএম, ১২ মে ২০২৬
যমুনার পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন পুঁজিহীনরা/ ছবি: জাগো নিউজ

পাবনার বেড়ায় যমুনা নদী এখন শুধু মাছের ভাণ্ডার নয়, হয়ে উঠেছে জীবিকারও নির্ভরতা। পুঁজিহীন প্রায় ২৫টি পরিবার নদী থেকে পানি তুলে পৌঁছে দিচ্ছেন হোটেল, চায়ের দোকান, ক্ষুদ্র কারখানা ও গৃহস্থালির কাজে। নদীর এই পানি বিক্রির আয়েই চলছে তাদের সংসার। যেখানে দেশের অন্য প্রান্তে বন্যার পানি দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে, সেখানে বেড়ায় নদীর পানি বুনছে বেঁচে থাকার নতুন গল্প।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, এ পেশায় অন্তত ২৫ জন মানুষ যুক্ত রয়েছেন। তারা যমুনা ও হুরাসাগর নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে বিভিন্ন দোকান, হোটেল, চায়ের স্টল, ক্ষুদ্র কারখানা ও অনুষ্ঠান বাড়িতে সরবরাহ করেন।

স্থানীয়রা বলছেন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও চায়ের দোকানগুলোতে নদীর পানির চাহিদা বেশি। তাদের দাবি, এই পানিতে রান্না করলে ও চা বানালে খাবারের রং-স্বাদ ভালো থাকে।

অন্যদিকে, এলাকার বেশির ভাগ নলকূপের পানিতে অতিরিক্ত আয়রন থাকায় ভাত-ডাল ঠিকমতো সিদ্ধ হয় না। চায়ের রংও ভালো আসে না। এ কারণে নদীর পানির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বেড়া বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী এনামুল হক বলেন, আমার হোটেলে প্রতিদিন অনেক রান্না করতে হয়। নলকূপের পানিতে আয়রন বেশি থাকায় রান্না ভালো হয় না। নদীর পানি ব্যবহার করলে ভাত, ডালসহ সবকিছুর মান ভালো থাকে, স্বাদও ঠিক থাকে। পানি বিক্রেতারা ভ্যানে করে একেবারে দোকানে পানি পৌঁছে দিয়ে যান। বিনিময়ে নির্ধারিত টাকা তাদের আমরা দেই। এতে আমাদের পানির প্রয়োজন মেটার পাশাপাশি সরবরাহকারীদের জীবিকার ব্যয়ও মিটছে।

মোহনগঞ্জ বাজারের চায়ের দোকানদার মোকবুল হোসেন বলেন, টিউবওয়েলের পানিতে চায়ের রং ঠিক আসে না। নদীর পানি ফুটিয়ে ব্যবহার করলে চায়ের স্বাদ ভালো হয়। তাই অধিকাংশ দোকানিই এই পানি ব্যবহার করি।

বিভিন্ন দোকানি ও পানি বিক্রেতারা জানান, পানি বিক্রেতারা সাধারণত ২৫ লিটার ধারণক্ষমতার বিশেষ প্লাস্টিকের পাত্রে পানি সরবরাহ করে থাকেন। যা স্থানীয়ভাবে ‘ডোপ’ নামে পরিচিত। প্রতি ডোপ পানির দাম নেওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ টাকা। একজন বিক্রেতা দিনে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ ডোপ পানি সরবরাহ করেন। এতে তাদের দৈনিক আয় হয় প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।

বেড়া পৌর এলাকার বিভিন্ন হোটেল, চায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র কারখানায় নিয়মিত যমুনা নদীর পানি সরবরাহ করেন পৌর এলাকার মোহনগঞ্জ মহল্লার বাসিন্দা আমানত আলী।

পুঁজিহীনদের জীবিকার নতুন পথ যমুনার পানি

তিনি বলেন, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এই কাজ করছি। ভোরের আলো ফোটার আগেই নদীতে যাই। এরপর চাহিদা অনুযায়ী ড্রাম বা অন্যান্য পাত্রে পানি ভরে দোকান ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে পোঁছে দেই। বিয়ে বা এ ধরনের অনুষ্ঠানে রান্নাসহ অন্যান্য প্রয়োজনেও অনেকে পানি চান। তাদেরও একই প্রক্রিয়ায় পানি দেই। দিনে ৫০০-৬০০ টাকার মতো আয় হয় পানি বেচে। এ দিয়েই আমার সংসার চলছে।

বেড়া বাজারের পানি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, অন্য কোনো কাজ না থাকায় এই পেশাতেই আছি। হুরাসাগর নদী থেকে পানি আইন্যা বিভিন্ন দোকানে দেই। এই আয় দিয়্যা মোটামুটি সংসার চালাই নিত্যাছি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর পানি সরাসরি ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা জানান, নদীর পানিতে জীবাণু ও দূষিত উপাদান থাকতে পারে। অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকে। তাই পানি ফুটিয়ে বা প্রাথমিকভাবে পরিশোধন করে ব্যবহার করা জরুরি।

বেড়ার মনজুর কাদের মহিলা কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, উপজেলার এই মানুষগুলোর কাছে যমুনা ও হুরাসাগর শুধু নদী নয়- এগুলোই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। নদীর ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে এক ভিন্নধর্মী পেশা, যা এখনো টিকিয়ে রেখেছে বেশ কিছু পরিবারের জীবনের চাকা। এভাবেই নদী জীবন ও জীবিকার গল্প বুনে চলে।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা বলেন, বিভিন্নভাবে সার্ফেস ওয়াটার ব্যবহার হয়ে থাকে। তবে সেটি নিরাপদ করে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে নদীর মতো উৎস থেকে যদি পানিকে নিরাপদ করে ব্যবহার করা যায় সেটির তেমন নেতিবাচক দিক নেই, বরং ইতিবাচক দিক রয়েছে। কেননা এর মধ্য দিয়ে পানি সরবরাহকারীদের আয়ের জোগান হচ্ছে। অন্যদিকে বেড়ায় আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত পানির ব্যাপক অভাব রয়েছে সেটির ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরাও কিছুটা ঝুঁকিমুক্ত থাকছেন। তবে এটি স্থায়ী কোনো বিষয় নয় জানিয়ে নিরাপদ পানির এই ক্রাইসিস মেটাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পাবনা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, নদীর মতো খোলা উৎস থেকে সংগৃহীত পানিতে বিভিন্ন ধরনের দূষণ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সঠিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে পানিকে নিরাপদ করে ব্যবহার করা উচিত। নাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থেকে যায়।

তিনি বলেন, এর বাইরে আমরা নিরাপদ পানির জন্য জেলার অন্যান্য অঞ্চলের মতো বেড়াতেও কাজ করছি। গ্রাম পর্যায়ে নিরাপদ গভীর নলকূপ স্থাপন ও কমিউনিটি ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেম করে করে দিচ্ছি। এছাড়া পৌর এলাকায় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এটির মাধ্যমে পানিকে আয়রন ও দুষণমুক্ত করে পৌর পাইপে দেওয়া হচ্ছে।

এনএইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।