গরুর খামারে কপাল খুলেছে নুন আনতে পান্তা ফুরানো ছালেমার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি জয়পুরহাট
প্রকাশিত: ০৪:৫৯ পিএম, ১২ মে ২০২৬

একসময় নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার ছিল জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার ছালেমা খাতুনের। কিন্তু অদম্য ইচ্ছা আর গবাদিপশু পালনের পরিশ্রমে আজ তিনি সাফল্যের শিখরে। নিজের খামারের আয় দিয়ে ছালেমা শুধু ইটের আধুনিক ফ্ল্যাট বাড়িই বানাননি, কিনেছেন ৫-৬ বিঘা বর্গা জমিও। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা ও বিয়ের খরচ মিটিয়ে এখন তিনি এলাকায় এক স্বাবলম্বী নারীর প্রতিচ্ছবি। ছালেমার এই অভাবনীয় সাফল্য এখন পুরো জয়পুরহাট জেলার গ্রামীণ অর্থনীতির পরিবর্তনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

ছালেমা খাতুনের মতো জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, কালাই, ক্ষেতলাল, আক্কেলপুর ও সদর উপজেলার হাজার হাজার খামারি এখন গবাদিপশু পালনে খুঁজে পেয়েছেন ভাগ্যের চাকা। আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে জেলার ২৬ হাজার খামারে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পশুপালন এখন আর কেবল মৌসুমি কোনো কাজ নয় বরং এটি এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

কালাই পৌরসভার থুপসাড়া মহল্লার নারী খামারি ছালেমা খাতুন জানান, সারা বছর তার খামারে ৬-৭টি গরু থাকে এবং প্রতি বছর অন্তত দুটি গরু বিক্রি করেন। গরু পালন করেই তিনি ইটের বাড়ি ও খামার গড়ে তুলেছেন, পাশাপাশি কয়েক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করছেন। দুধ বিক্রির আয়েই সংসার ও গরুর খাদ্যের খরচ মেটান। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে বিয়েও দিয়েছেন। তার দেখাদেখি এলাকার অনেক পরিবারও এখন গরু পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জয়পুরহাটে রেকর্ড পরিমাণ কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৫৩টি পশু কোরবানির জন্য তৈরি, যার বিপরীতে স্থানীয় চাহিদা ২ লাখ ৩ হাজার পশুর। ফলে জেলা থেকে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে, যা রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পশুর চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখবে।

গরুর খামারে কপাল খুলেছে নুন আনতে পান্তা ফুরানো ছালেমার

তৃণমূলের এই সাফল্যের কারিগরদের মধ্যে পাঁচবিবির সরাইল-মোহাম্মদপুরের এ এন মহিউদ্দিনের খামারে রয়েছে ১২০টি গরু। আবার কালাইয়ের পাঁচশিরা এলাকার আলী আনছার, যিনি ২০১৫ সালে চাতাল ব্যবসা ছেড়ে মাত্র ৫টি গরু দিয়ে শুরু করেছিলেন, তার খামারে এখন ১৯টি গরু।

আলী আনছার জানান, শুধু দুধ বিক্রির টাকা দিয়েই খামারের দৈনন্দিন খরচ উঠে যায়, আর বড় গরু বা বাছুর বিক্রি থেকে আসে নিট মুনাফা। প্রতিটি গরু দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করে তিনি এখন সচ্ছল।

পশুপালনের এই বিপ্লবে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপদ পদ্ধতি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মহির উদ্দিন জানান, খামারিরা এখন ক্ষতিকর ইনজেকশন বা ওষুধের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপায়ে ঘাস, ভুট্টা ও খৈল খাইয়ে পশু মোটাতাজাকরণে বেশি আগ্রহী। এতে ভোক্তা পর্যায়ে নিরাপদ মাংস নিশ্চিত হচ্ছে। এছাড়া জেলার ১০টি স্থায়ী ও ১৭টি অস্থায়ী পশুর হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সহায়তায় ১৩টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করবে।

খামারকেন্দ্রিক এই অর্থনীতি গ্রামগুলোতে বহুমুখী উপ-অর্থনীতি সচল করেছে। গোখাদ্য বিক্রেতা, পশুচিকিৎসক, পরিবহন শ্রমিক এবং বাঁশ-দড়ির ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ।

কালাইয়ের গোখাদ্য ব্যবসায়ী জালাল উদ্দীন বলেন, কোরবানির মৌসুমে আমাদের বেচাকেনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থাকে চাঙ্গা রাখছে।

তবে খামারিদের মতে, গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সহজ শর্তে ঋণের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এখাত বেকারত্ব দূরীকরণে এক বিরাট শক্তি।

কালাই সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আব্দুল ওহাব সাখিদার বলেন, পশুপালন পরিবারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়াচ্ছে এবং নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছে। গ্রামে ইটের পাকা বাড়ি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন প্রমাণ করে, গরুর খামার এখন গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাহফুজ রহমান/এনএইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।