মহাস্থান জাদুঘর
গুদামেই বন্দি হাজার বছরের অমূল্য প্রত্নবস্তু
• প্রদর্শনীতে রয়েছে ৮০০-৯০০ প্রত্নবস্তু
• মূল্যবান অনেক প্রত্নবস্তু গুদামে তালাবদ্ধ
• গতবছর দর্শনার্থী এসেছে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৮৯ জন
• পর্যটক বেশি শ্রীলঙ্কা-ফ্রান্স-জাপান-রাশিয়ার
• আধুনিকায়নে ৮ কোটি টাকার প্রকল্প পরিকল্পনা
দেশের প্রাচীনতম জনপদ মহাস্থানগড় ঘিরে ছড়িয়ে আছে হাজার বছরের সভ্যতার স্মৃতি। সেই ইতিহাসের বড় একটি অংশ সংরক্ষিত রয়েছে মহাস্থান জাদুঘরে। প্রায় ২৩০০ বছর আগের লিপিবিহীন ঢালাই মুদ্রা, খ্রিস্টপূর্ব যুগের মাটির চুলা, ব্রোঞ্জের মুদ্রা, বিষ্ণু ও গণেশ মূর্তি, তলোয়ার, প্রাচীন হাতিয়ার, পোড়ামাটির ফলক—সব মিলিয়ে এটি এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নভান্ডার। বছরে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি দর্শনার্থী এখানে এলেও প্রদর্শনীর বাইরে গুদামে পড়ে আছে বহু মূল্যবান প্রত্নবস্তু। যা দেখতে পারছেন না তারা।
জাদুঘর সূত্র বলছে, বর্তমানে এখানে প্রদর্শনীতে রয়েছে ৮০০-৯০০ প্রত্নবস্তু। তবে এর বাইরেও অতিরিক্ত, দুর্লভ ও মূল্যবান বহু নিদর্শন তাদের গুদামে সংরক্ষিত রয়েছে। তবে ঠিক কতগুলো প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত আছে, সে তথ্য প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। তারা জানিয়েছেন, মূল্যবান হওয়ায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন ছাড়া সেখানে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।

জাদুঘরের ভেতরে ঘুরে দেখা যায়, ৪৪টি শোকেসে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন যুগের প্রত্নবস্তু। প্রতিটি শোকেস যেন বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের আলাদা আলাদা অধ্যায়। কোথাও শুঙ্গ যুগের (মৌর্য-পরবর্তী যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়) পোড়ামাটির ফলক, কোথাও পাল আমলের মূর্তি, কোথাও পাথরের ভাস্কর্য, আবার কোথাও লিপিমালা, সিল ও প্রসাধন সামগ্রী। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ মনোযোগ দিয়ে শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে তথ্য পড়ছেন। আবার কেউ গাইডের ব্যাখ্যা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করছেন।
সবচেয়ে পুরোনো নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ২ নম্বর শোকেসে রাখা লিপিবিহীন ঢালাই মুদ্রা। এগুলো খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের। অর্থাৎ প্রায় ২৩০০ বছর আগের। ধারণা করা হয়, এগুলো মৌর্য আমলের সমসাময়িক। ১৩ নম্বর শোকেসে থাকা মাটির চুলাটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এগুলো প্রাচীন বাংলার নগর সভ্যতা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে। এছাড়া শুঙ্গ যুগের পোড়ামাটির ফলক, পাল আমলের অসংখ্য মূর্তি, প্রস্তর নির্মিত প্রসাধন সামগ্রী, গোলাকার প্রস্তর, লিপিমালা সম্বলিত পোড়ামাটির সিলসহ নানা ধরনের প্রত্নবস্তু রয়েছে এখানে। জাদুঘর সূত্র জানিয়েছে, পাল আমলের নিদর্শনই সবচেয়ে বেশি।

মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় ও চতুর্থ শতকের নিদর্শনগুলোই সবচেয়ে পুরোনো। বর্তমানে প্রদর্শনীতে ৮০০-৯০০ প্রত্নবস্তু রয়েছে। সবকিছুর ডিজিটাল তালিকা করা হয়েছে। নিয়মিত ইনভেন্টরি (মজুত) অডিট হয়। প্রত্নবস্তু চুরি বা নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে অনুসন্ধানে থানায় কখনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, বিগত পাঁচ বছরে কোনো প্রত্নবস্তু নিখোঁজ হয়নি। চুরির ঘটনাও ঘটেনি। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো আছে।
শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহিনুল ইসলাম জানান, বিগত পাঁচ বছরে জাদুঘর থেকে প্রত্নবস্তু চুরি, নিখোঁজ বা চুরির চেষ্টার বিষয়ে কোনো জিডি হয়নি।

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে মিউজিয়ামে ১১টি সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রয়েছে। আরও ২-৩টি নতুন ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন ১৫ জন আনসার সদস্য। পাশাপাশি জাদুঘরের নিজস্ব চারজন স্টাফও দিনরাত দায়িত্ব পালন করেন। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও রয়েছে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্য আকরাম জানান, রাতে আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্য ও জাদুঘরের স্টাফ মিলে পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে কোনো চুরির ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হাজার বছরের পুরোনো প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণের জন্য শুধু পাহারা বা সিসিটিভি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের সংরক্ষণ ব্যবস্থাও।

নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও যাচ্ছে না। কেননা প্রদর্শনীর বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক প্রত্নবস্তুর অবস্থান ও সংরক্ষণ পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য অদৃশ্যই রয়ে গেছে। জাদুঘরের স্টোররুম ঘিরে রয়েছে এক ধরনের গোপনীয়তা। সেখানে কীভাবে প্রত্নবস্তু সংরক্ষণ করা হয়, কোন অবস্থায় রাখা হয়, কতগুলো নিদর্শন সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে পড়ে আছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহাস্থান জাদুঘর থেকে বিভিন্ন সময়ে দেশের অন্য জাদুঘরেও প্রত্নবস্তু পাঠানো হয়েছে। দিনাজপুর, পুঠিয়া ও রংপুরের জাদুঘরে এখানকার কিছু নিদর্শন স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া বহু বছর আগে জাতীয় জাদুঘরেও পাঠানো হয়েছিল বেশ কিছু প্রত্নবস্তু।
জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান শাহরিয়ার সাফি হাসান বলেন, ‘অতিরিক্ত বা একই ধরনের প্রত্নবস্তু বিভিন্ন জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়েছে। আবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও কিছু নিদর্শন এনে এখানে রাখা হয়েছে।’

প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে জাদুঘর এলাকা। গতবছর এখানে দর্শনার্থী এসেছে পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৮৯ জন। এর মধ্যে দেশি পর্যটক পাঁচ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৮ জন এবং বিদেশি পর্যটক এক হাজার ২৮১ জন।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদের সময় দর্শনার্থীর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। দিনে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে প্রায় ৯ হাজার মানুষ পর্যন্ত জাদুঘরে প্রবেশ করে।
সহকারী কাস্টডিয়ান শাহরিয়ার সাফি হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, জাপান ও রাশিয়া থেকে পর্যটকরা বেশি আসেন। কেউ ছবি তুলতে আসেন, আবার কেউবা আসেন গবেষণা বা জানার আগ্রহ নিয়ে। আগত মুসলিম পর্যটকদের কেউ কেউ বলেন এখানে মুসলিম নিদর্শন কম। তখন আমরা বলি, প্রথম দিকের সময়ে এখানে বৌদ্ধ ও হিন্দু সভ্যতার প্রভাব বেশি ছিল। এজন্য ওই ধর্মের নিদর্শন বেশি পাওয়া যায়।’

জাদুঘর ঘুরে দেখা যায়, দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে প্রাচীন মুদ্রার শোকেসে। বিশেষ করে ব্রোঞ্জের মুদ্রা মানুষের দৃষ্টি কাড়ে বেশি। এছাড়া তলোয়ার, প্রাচীন হাতিয়ার, বিষ্ণু, গণেশ ও কন্যাকুমারীর মূর্তির সামনেও দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
‘সবচেয়ে পুরোনো নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে ২ নম্বর শোকেসে রাখা লিপিবিহীন ঢালাই মুদ্রা। এগুলো খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের। অর্থাৎ প্রায় ২৩০০ বছর আগের। ধারণা করা হয়, এগুলো মৌর্য আমলের সমসাময়িক। ১৩ নম্বর শোকেসে থাকা মাটির চুলাটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের’
জাদুঘরের প্রদর্শনী ও তথ্য উপস্থাপন নিয়ে কিছু দর্শনার্থীর মধ্যে অসন্তোষও দেখা গেছে। নেত্রকোনার আটপাড়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক সুলতান আহমেদ বলেন, ‘পাল শাসনামলের ইতিহাস বইয়ে যেভাবে পড়েছি, এখানে এসে তার তেমন প্রতিফলন দেখিনি। কিছু পোড়ামাটির মূর্তি ছাড়া ওই সময়ের জীবনযাত্রা বা ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। ইতিহাস মানে অতীতের জীবন্ত সাক্ষী কিন্তু এখানে সেই উপস্থাপনার ঘাটতি আছে।’
কুষ্টিয়া থেকে আসা কে এম পারভেজ বলেন, ‘বাইরের মানুষ হিসেবে আমরা যা দেখছি সেটাকেই পুরো ইতিহাস মনে করছি। এর বাইরেও যদি গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকে, সেটা তো আমাদের বোঝার সুযোগ নেই।’
‘পাল শাসনামলের ইতিহাস বইয়ে যেভাবে পড়েছি, এখানে এসে তার তেমন প্রতিফলন দেখিনি। কিছু পোড়ামাটির মূর্তি ছাড়া ওই সময়ের জীবনযাত্রা বা ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। ইতিহাস মানে অতীতের জীবন্ত সাক্ষী কিন্তু এখানে সেই উপস্থাপনার ঘাটতি আছে’—দর্শনার্থী
তবে অনেক দর্শনার্থী প্রদর্শনী নিয়ে সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছেন। রংপুর থেকে আসা ফাহিম হাসান জানান, তার কাছে প্রাচীন ও মধ্যযুগের নারী মূর্তিগুলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে। আর ময়মনসিংহের মনজুরুল হকের ভাষ্য, সোনা ও রুপার কয়েনগুলো সবচেয়ে ভালো লেগেছে।

বিদেশি পর্যটকদের অনেকেই ইতিহাস জানতে আগ্রহ দেখান। শ্রীলঙ্কা থেকে আসা আথুলিয়া কুমার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আরও আধুনিক ডিসপ্লে, ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থা ও ইংরেজি ব্যাখ্যা বাড়ানো গেলে জাদুঘরটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বিদেশিদের জন্য অডিও গাইড, ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লে ও মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনার ব্যবস্থা থাকলে এটি আরও সমৃদ্ধ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।’
‘৪৪টি শোকেসে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন যুগের প্রত্নবস্তু। প্রতিটি শোকেস যেন বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের আলাদা আলাদা অধ্যায়। কোথাও শুঙ্গ যুগের পোড়ামাটির ফলক, কোথাও পাল আমলের মূর্তি, কোথাও পাথরের ভাস্কর্য, আবার কোথাও লিপিমালা, সিল ও প্রসাধন সামগ্রী’
কর্তৃপক্ষ বলছে, জাদুঘরকে আধুনিকভাবে সাজাতে বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মহাস্থানগড় জাদুঘর স্থানান্তর ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে অনন্তবালা এলাকায় ছয় একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে আট কোটি টাকারও বেশি।
এ বিষয়ে জাদুঘরের কাস্টডিয়ান রাজিয়া সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাদুঘর স্থানান্তরের জন্য অনন্তবালা এলাকায় ছয় একর জমি অধিগ্রহণ করা শেষ। মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের টাকা ডিসি অফিসের ট্রেজারিতে রয়েছে। জমির মালিকদের পাওনা পরিশোধের পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
‘জাদুঘর স্থানান্তরের জন্য অনন্তবালা এলাকায় ছয় একর জমি অধিগ্রহণ করা শেষ। মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দের টাকা ডিসি অফিসের ট্রেজারিতে রয়েছে। জমির মালিকদের পাওনা পরিশোধের পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে’—জাদুঘরের কাস্টডিয়ান
তিনি জানান, নতুন জাদুঘরে প্রশাসনিক ভবন, ডরমেটরি, পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিং, ফুড কোর্ট এবং দর্শনার্থীদের জন্য পিকনিক স্পট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত স্থানটি বর্তমান জাদুঘরের অদূরে অনন্তবালা এলাকায় অবস্থিত। জায়গাটি করতোয়া নদীর পাড়-সংলগ্ন।
এসআর/এমএস