কুকুরের কামড়ের পর ভ্যাকসিন নিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না

আনোয়ার আল শামীম আনোয়ার আল শামীম , জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ০৬:১৮ পিএম, ১৭ মে ২০২৬
কুকুরের কামড়ে কয়েকজনের মৃত্যুর পর স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে/ছবি: জাগো নিউজ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত মোট ১৪ জনই যথাসময়ে ভ্যাকসিন নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসকদের দাবি, কামড়ানোর পর ক্ষতস্থান সাবান দিয়ে যথাযথভাবে পরিষ্কার না করা, ভ্যাকসিনের ‘কোল্ড চেইন’ বজায় না থাকা এবং জরুরি ‘আরআইজি’ না নেওয়ার কারণেই এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম জলাতঙ্ক আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সরেজমিনে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কুকুরের কামড়ে আহত ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। একটি কুকুরের কামড়ে এতগুলো মানুষের মৃত্যুতে স্বজনদের মাঝে চলছে আহাজারি। নিহতের স্বজনরা কোনোভাবেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। আহত ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা আর ভয়ের ছাপ। দিন-রাত কাটছে চরম উৎকণ্ঠায়।

জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধুবনী বাজার গ্রামের বাসিন্দা ও কুকুরের কামড়ে মারা যাওয়া ফুল মিয়ার স্ত্রী জমিলা খাতুন বলেন, ‘ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমার স্বামী বাড়ির পাশের জমিতে বসে পাটক্ষেত নিড়ানির (আগাছা পরিষ্কার) কাজ করছিলেন। এমন সময় একটি কুকুর এসে তার নাকে কামড় দেয়। তিনি চিৎকার দিয়ে নাক চেপে ধরে বাড়িতে আসেন। নাক দিয়ে প্রচুর রক্ত পড়ছিল। এরপর কয়েক মিনিট শুধু গরম পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করি, সাবান দিইনি। কিন্তু রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। দুপুরে তোয়ালে দিয়ে নাক চেপে ধরে তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে নাকে সেলাই দেওয়া হয়।’

আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে একটি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। বাইরে থেকে আরেকটি কিনে মোট দুটি ভ্যাকসিন দিই সেদিন। বিকেলে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসি। সাতদিন পর, ২৯ এপ্রিল হাসপাতাল থেকে সেলাই কেটে আনা হয়। ওইদিন রাতেই তার জ্বর আসে। কয়েকদিন ওষুধ খাওয়ানোর পর ৩ মে আবার গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই এবং ওইদিনই বাড়িতে ফিরিয়ে আনি। কিন্তু ওই রাতেই তার বমি শুরু হয়। এরপর ৬ মে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে স্যালাইন দেওয়া হয়। রাত আনুমানিক আটটার দিকে তিনি হাসপাতালে মারা যান।’

কুকুরের কামড়ের পর ভ্যাকসিন নিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জমিলা খাতুন আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর উপার্জনে সংসার চলত। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে, আরেক মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত। এখন কীভাবে সংসার চলবে, সেই চিন্তায় আছি।’

স্থানীয় বাসিন্দা হাফিজুর বলেন, ‘একটা কুকুর এতগুলো মানুষের জীবন নিলো, আমাদের মনে শান্তি বলতে কিছু নেই। কুকুর কামড়ালেই মানুষ মারা যাবে ভাই, এটা কেমন কথা?’

ভ্যাকসিন দেওয়ার পরও কেন মৃত্যু হলো, জানতে চাইলে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন মো. রফিকুজ্জামান বলেন, ‘ভ্যাকসিন দেওয়ার পরও মারা যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। যেমন—কুকুরে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান কাপড় কাচার সাবান দিয়ে অন্তত ১৫-২০ মিনিট ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়। সুন্দরগঞ্জে যারা মারা গেছেন, তাদের ক্ষেত্রে হয়তো এভাবে পরিষ্কার করা হয়নি। এছাড়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন এবং আরআইজি (র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন) দিতে হবে। ভ্যাকসিনের ‘কোল্ড চেইন’ (নির্দিষ্ট তাপমাত্রা) মেইনটেইন করা জরুরি। অনেকে হয়তো ভ্যাকসিন দিয়েছেন, কিন্তু আরআইজি দেননি।’

আরও পড়ুন:
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্য
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে হয়তো যে দোকান থেকে ভ্যাকসিন কিনেছেন, সেখানে সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীরা কথা বলে দেখেছেন, তারা কুকুরে কামড়ানোর পরপরই এই প্রাথমিক ও জরুরি কাজগুলো যথাযথভাবে করতে পারেননি।’

সিভিল সার্জন আরও বলেন, ‘বিষয়টি বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এছাড়া সুন্দরগঞ্জে স্বাস্থ্য বিভাগের সাত সদস্যের একটি টিম কাজ করছে। টিমের সদস্যরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি তদারকি করছেন।’

তিনি আরও জানান, ‘অনেকে ভ্যাকসিন নিতে বিলম্ব করেছেন, যার ফলে ভাইরাস দ্রুত স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে গেছে। যে পাঁচজন মারা গেছেন, কুকুর তাদের সবাইকে মুখমণ্ডলে কামড় দিয়েছিল। ক্ষতস্থান মাথার কাছাকাছি থাকলে জলাতঙ্ক ছড়ানোর এবং মারা যাওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এসব কারণের যেকোনো একটির জন্য তারা মারা গিয়ে থাকতে পারেন।’

উপজেলার বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী লিমো আক্তার (১১) বলে, ‘বাড়ি থেকে হেঁটে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলে যাচ্ছিলাম। হাতে শুধু বই ছিল। স্কুলের কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ একটি কুকুর এসে আমার গায়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে। আমি মাটিতে পড়ে যাই এবং সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটি আমার মুখে ও গলায় কামড়াতে থাকে। পাশে এক প্রতিবেশী দাদি ছিলেন, আমি তাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরি।’

‘কুকুরটি আমাকে ছেড়ে দাদির বুকে ও হাতে কামড় দেয়। তখন আমার মুখ থেকে রক্ত ঝরছিল। পরে স্কুলের শিক্ষিকারা এসে আমাকে স্কুলে নিয়ে গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে রাখেন। তবুও রক্ত পড়ছিল। এরপর শিক্ষিকারা বাড়িতে ফোন করলে মা আমাকে এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। সেখানে ক্ষতস্থান পানি দিয়ে ধোয়া হয় এবং রক্ত পড়া বন্ধ করে দুপুরে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। তিনদিন পর আবার হাসপাতালে যাই, সেখানে পাঁচদিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরি।’

কুকুরের কামড়ের পর ভ্যাকসিন নিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না

কুকুরের কামড়ে আহত একই গ্রামের মিতু আক্তার (১৬) বলে, ‘বাড়ির উঠানে বসেছিলাম। হঠাৎ একটি কুকুর এসে আমার হাতে কামড় দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আমি হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছি।’

একই গ্রামের আরেক শিক্ষার্থী লাবণ্য আক্তার (১১), যে স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, সে জানায়, স্কুলে যাওয়ার সময় কুকুর তার মুখমণ্ডলে কামড় দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। হাসপাতালে প্রায় ছয়দিন চিকিৎসা শেষে সে বাড়িতে ফিরে আসে। লাবণ্য বলে, ‘এখন মোটামুটি ভালো আছি, তারপরও মনে খুব চিন্তা হয়।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও স্থানীয়দের ক্ষোভ

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বাজার, রাস্তা ও আবাসিক এলাকায় অবাধে ঘুরে বেড়ানো কুকুরের কারণে প্রায়ই মানুষ আক্রমণের শিকার হচ্ছে।

এসব বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোজাম্মেল হক বলেন, ‘গত তিন বছরে উপজেলায় বেওয়ারিশ কুকুরের টিকার কোনো বরাদ্দ আসেনি। তবে পোষা কুকুরের জন্য সীমিত পরিমাণ ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, ‘মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া অনেক বেশি সাশ্রয়ী। কারণ মানুষের ভ্যাকসিনের দাম অনেক বেশি। সব বেওয়ারিশ কুকুরকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পারলে জলাতঙ্ক পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব।’

সরকারি পদক্ষেপ

গাইবান্ধা জেলায় গত শনিবার ভোররাত থেকে কুকুরকে ভ্যাকসিন (রেবিস কিল) দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রথম দিন গাইবান্ধা জেলা শহরে এ কার্যক্রম চালানো হয়। গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ভ্যাকসিন প্রদানের জন্য গত শুক্রবার সন্ধ্যায় সিরাজগঞ্জ থেকে ১৮ সদস্যের একটি টিম গাইবান্ধায় এসেছে। প্রাথমিকভাবে জেলায় চার থেকে পাঁচ হাজার কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।’

এদিকে কুকুরের কামড়ে মারা যাওয়া সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচজনের প্রতি পরিবারকে সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের প্রতি পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘মারা যাওয়া এবং আক্রান্তদের পরিবারকে সহায়তা প্রদান অব্যাহত থাকবে। এছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে সার্বিক বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে।’

প্রেক্ষাপট

গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি, কঞ্চিবাড়ি এবং পাশের ছাপড়হাটি ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুর নারী-শিশুসহ অন্তত ১৪ জনকে কামড় দিয়ে আহত করে। এরপর আক্রান্তরা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভ্যাকসিন নিতে শুরু করেন। এর মধ্যে তিনজন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এবং দুজন নিজ বাড়িতে মারা যান।

মৃত ব্যক্তিরা হলেন- গত ৬ মে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫) ও ধুবনী বাজার গ্রামের নায়েব উদ্দিনের ছেলে ফুল মিয়া (৫২); ৮ মে ছাপড়হাটি ইউনিয়নের পূর্ব ছাপড়হাটি গ্রামের খোকা বর্মণের ছেলে রতনেশ্বর বর্মণ (৪২); গত মঙ্গলবার (১২ মে) কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের মতিয়ার রহমানের স্ত্রী আফরোজা বেগম (৪০) এবং বুধবার দুপুরে একই ইউনিয়নের ধুবনী বাজার এলাকার আবদুস সালামের স্ত্রী সুলতানা বেগম (৩৯)। অন্যদিকে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে নয়জন বর্তমানে বাড়িতে অবস্থান করছেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক বলেন, ‘কুকুরের কামড়ে পাঁচজনের মৃত্যুর পর আমরা ৩০টি ভ্যাকসিন পেয়েছি। যারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসছেন, তাদের শরীরে তা পুশ করা হচ্ছে। আরও ভ্যাকসিনের চাহিদা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’

তবে স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কুকুরের কামড়ে আহত হওয়ার পর সঠিক সময়ে ভ্যাকসিন না পেয়ে মানুষ মারা গেল। যখন দরকার ছিল তখন না পেয়ে, এখন অন্য সময় ভ্যাকসিন দিয়ে কী লাভ হবে? সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে কেউই কখনো ভাবেন না, সবাই সাধারণ মানুষকে অবহেলা করেন।’

আনোয়ার আল শামীম/এমএন/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।