কুয়াকাটা সৈকতে ১৬৩ কচ্ছপের বাচ্চা উদ্ধার
পটুয়াখালীর কুয়াকাটার সৈকতের লেম্বুরবন বনাঞ্চল সংলগ্ন বালিয়াড়ি এলাকায় ১৬৩ সামুদ্রিক কচ্ছপের বাচ্চা উদ্ধার করা হয়েছে। বালিয়াড়ি এলাকায় একটি পরিত্যক্ত দোকানের নিচ থেকে বাচ্চাগুলো উদ্ধার করা হয়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরে ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। পরে বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যদের উপস্থিতিতে বাচ্চাগুলোকে নিরাপদে আন্ধারমানিক নদী সংলগ্ন তিন নদীর মোহনায় অবমুক্ত করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার সকালে নিজের ফিশফ্রাই দোকান খুলতে যান লেম্বুরবন এলাকার ব্যবসায়ী মো. বায়েজিদ। দোকানের চারপাশ পরিষ্কার করার সময় বালুর মধ্যে ছোট ছোট কিছু প্রাণীর নড়াচড়া দেখতে পান। কাছে গিয়ে দেখেন কয়েকটি কচ্ছপের বাচ্চা বালুর ওপর উঠে আসছে। পরে বিষয়টি আশপাশের লোকজনকে জানালে তারা বালু সরিয়ে একটি গর্তের মধ্যে আরও কচ্ছপের বাচ্চা দেখতে পান। খবর পেয়ে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উপরা’র সদস্যরা উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে।
উদ্ধারকারীরা জানান, গর্তটির ভেতরে কচ্ছপের ডিমের খোসা, ছোগলা এবং সদ্য ফোটা বাচ্চাগুলো পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক সপ্তাহ আগে মা কচ্ছপটি নিরিবিলি স্থান হওয়ায় সেখানে ডিম পেড়ে যায়। পরে ডিম ফুটে বাচ্চাগুলো বের হয়ে আসে। কিন্তু দোকানের কাঠামো ও বালুর বাধার কারণে তারা সাগরের যেতে পারেনি।
উদ্ধারের পর উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন ‘উপরা’র সদস্যরা বনবিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনকে খবর দেন। পরে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে কচ্ছপের বাচ্চাগুলোকে প্লাস্টিকের পাত্রে করে সৈকতের কাছাকাছি নিরাপদ এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে কিছু সময় পর্যবেক্ষণের পর বিকেলের দিকে আন্ধারমানিক নদী সংলগ্ন তিন নদীর মোহনায় অবমুক্ত করা হয়। এসময় স্থানীয় উৎসুক মানুষ, পর্যটক ও পরিবেশকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন ‘উপরা’র আহ্বায়ক কে এম বাচ্চু বলেন, এগুলো মূলত অলিভ রিডলি প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপের বাচ্চা। এ প্রজাতির কচ্ছপ সাধারণত গভীর রাতে নির্জন সৈকতে উঠে ডিম পাড়ে। কচ্ছপগুলো ডিম পাড়ার জন্য নিরাপদ ও নরম বালুময় স্থান খুঁজে নেয়। আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ডিমের খোসা, ছোগলা এবং জীবিত বাচ্চা পেয়েছি। ধারণা করছি, অন্তত ৪০-৬০ দিন আগে এখানে ডিম পেড়েছিল।
তিনি আরও বলেন, সামুদ্রিক কচ্ছপ উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ জাল, পর্যটকদের অসচেতনতা এবং উপকূল দখলের কারণে এদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কুয়াকাটা উপকূল শুধু পর্যটনের জন্য নয়, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। প্রতিবছর নির্দিষ্ট মৌসুমে অলিভ রিডলি কচ্ছপ উপকূলে এসে ডিম পাড়ে। কিন্তু মানুষের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহার, শব্দদূষণ এবং সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে কচ্ছপগুলো নিরাপদ পরিবেশ পাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আজ ১৬৩ কচ্ছপের বাচ্চা নিরাপদে সাগরে ফিরতে পেরেছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক খবর। তবে এদের অধিকাংশই প্রাকৃতিক নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হয়। তাই কচ্ছপ সংরক্ষণে স্থানীয় মানুষকে আরও সচেতন করতে হবে এবং উপকূলজুড়ে নিয়মিত মনিটরিং বাড়াতে হবে।
মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, উদ্ধার হওয়া সব কচ্ছপের বাচ্চাকে সুস্থ অবস্থায় নিরাপদে অবমুক্ত করা হয়েছে। সামুদ্রিক কচ্ছপ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বনবিভাগ নিয়মিতভাবে কুয়াকাটা উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি করছে, যাতে কচ্ছপের ডিম বা বাচ্চা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাওছার হামিদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধির প্রমাণ বহন করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সবসময় সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
আসাদুজ্জামান মিরাজ/এমএস