পশুর হাটে জাল টাকা-ছিনতাই ঠেকাতে এবার সর্বোচ্চ সতর্কতা
আর মাত্র কয়েকদিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদ উপলক্ষে এবার ঢাকায় ২৭টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরই মধ্যে ১৯টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। এবার হাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, জাল টাকা, ছিনতাই ও অজ্ঞানপার্টির তৎপরতা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে মাঠে থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবে র্যাব, পুলিশ ও ডিবির বিশেষ টিম।
গুরুত্বপূর্ণ পশুর হাট, প্রবেশপথ ও সড়কে থাকবে কড়া নিরাপত্তা, টহল ও সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ। পাশাপাশি পশুবাহী যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল ও চুরি-ডাকাতি এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতেও নেওয়া হয়েছে বহুমুখী প্রস্তুতি।
ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহা সামনে রেখে ২৭টির মধ্যে ১৯টি হাটের ইজারা সম্পন্ন করেছে দুই সংস্থা। এর মধ্যে ডিএনসিসির ইজারা দেওয়া হাটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দর উঠেছে উত্তরা দিয়াবাড়ি ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকার পশুর হাটের। এ হাটে সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা দর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে ডিএসসিসিতে কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ির পানির পাম্প পর্যন্ত বিস্তৃত হাটের ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সর্বোচ্চ দর উঠেছে। সর্বোচ্চ দরদাতারা এসব হাটের ইজারা বুঝে পেয়েছেন। বাকি ৮টি হাটের কোনোটিতে কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি, আবার কোনোটিতে কেউ দরপত্র দাখিল করেনি। ফলে এসব হাট ইজারায় পুনঃদরপত্র আহ্বান করেছে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি।
ডিএনসিসির পশুর হাট
ডিএনসিসি ৯ এপ্রিল ১২টি ও ২৮ এপ্রিল ৪টি হাটের জন্য পৃথক দরপত্র আহ্বান করে। পরে বিভিন্ন এলাকায় খালি জায়গা ও বাজার সংলগ্ন স্থানে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত দরে হাট ইজারা পান, যার মধ্যে উত্তরা দিয়াবাড়ির বউ বাজার এলাকায় সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা সম্পন্ন হয়। এছাড়া মিরপুর, খিলক্ষেত, বাড্ডা, বনরুপা, মহাখালীসহ বিভিন্ন স্থানে কোটি টাকার বিভিন্ন দরেও ইজারা দেওয়া হয়। তবে কিছু হাটে কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় পুনঃদরপত্র চলমান রয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, যে ১০টি হাটে সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া গেছে, তাদের হাটের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৬টি হাটে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কাঙ্ক্ষিত দর পেলে হাটগুলো ইজারা দেবে ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ।
ডিএসসিসির পশুর হাট
ডিএসসিসি ১৬ এপ্রিল ১১টি হাটের দরপত্র আহ্বান করে, যার মধ্যে ১৪ মে পর্যন্ত ৯টি হাটে সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এলাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে অবস্থিত হাটটি ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা পান কাজী মাহবুব মাওলা হিমেল। এছাড়া শাহজাহানপুর, আমুলিয়া, বাড্ডা, কাজলা ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে কোটি টাকার বেশি দরে হাট ইজারা সম্পন্ন হয়। তবে দুই হাটের কাঙ্ক্ষিত দর না পাওয়ায় এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সেগুলোতে পুনঃদরপত্র বা খাস আদায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাকি রয়েছে।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জাগো নিউজকে বলেন, এখন পর্যন্ত ৯টি হাটের ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। বাকি দুটি হাটে কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি। তাই বিধি অনুযায়ী এ দুটি হাটের বিষয়ে কী করণীয় তা জানতে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে।
আগামী ২৮ মে দেশে ঈদুল আজহা উদযাপন করা হবে। ঈদের দিনসহ মোট পাঁচদিন হাটে পুরোদমে কোরবানির পশু বেচাকেনা হবে। এই পশুর হাটকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের মুখপাত্র উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের পশুর হাটগুলোতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র্যাব সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পশুর হাট, সড়কপথ ও মহাসড়কে টহল ও চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
তিনি জানান, জাল টাকা শনাক্তকরণ, অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি, চুরি-ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিতে মোবাইল টিম, সাদা পোশাকে সদস্য এবং সিসিটিভি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
কোন হাটে যাবে কোরবানির পশু, ট্রাকে লিখতে হবে নাম-ঠিকানা
পাশের দেশ থেকে পশু প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে
হাটে ভারতীয় গরু না ঢুকলে লাভের আশা খামারিদের
র্যাবের এই কর্মকর্তা আরও জানান, অনলাইনে পশু কেনাবেচা ও কোরবানি কেন্দ্র করে প্রতারণা ঠেকাতে সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কে পশুবাহী যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে র্যাব।
তিনি সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো সন্দেহজনক তথ্য বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দেখলে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। হাটকেন্দ্রিক অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বাজার নজরদারি করা হবে।
তিনি বলেন, জাল টাকার বিস্তার রোধে বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে টাকা শনাক্তের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও জোরদার করা হবে।
ডিএমপির এই কর্মকর্তা আরও জানান, টহল পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে হাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সিটি করপোরেশন যেসব শর্তের ভিত্তিতে কোরবানির হাট ইজারা দিচ্ছে, সেগুলো যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন হয় তা নিশ্চিত করবে ডিবি।
তিনি বলেন, হাটকেন্দ্রিক ও সড়ককেন্দ্রিক সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিয়মের বাইরে কাউকে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।
চাঁদাবাজির বিষয়ে কড়া অবস্থানের কথা জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, এবার বাস্তবভিত্তিকভাবে গ্রুপ করে কাজ করা হচ্ছে। আগের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, গোপন ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ ও রশিদ সংগ্রহের মাধ্যমে চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যাদের নাম আসছে তাদের প্রোফাইলও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সে যেই হোক কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ঢাকা মহানগর এলাকায় পশুবাহী গাড়ি ও হাটকেন্দ্রিক চাঁদাবাজদের কোনোভাবেই রাস্তায় দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।
কোন হাটে যাবে পশু, ট্রাকেই থাকতে হবে স্পষ্ট পরিচয়
এদিকে বিগত বছরগুলোতে সড়ক থেকে পশুবাহী গাড়ি জোর করে নিজস্ব তত্ত্বাবধানের হাটগুলোতে জোরপূর্বক পশু নামাতে বাধ্য করার ঘটনা ঘটলেও এবার এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনির সদস্যরা। একই সঙ্গে রাস্তায় যাতে পশুবাহী গাড়ি অন্য কারও দ্বারা বাধাগ্রস্ত হতে না হয় সে বিষয়েও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।

সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম সোমবার (১৮ মে) এক বিবৃতিতে নির্দেশনা দিয়ে জানান, সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক দেশের যে কোনো স্থান থেকে কোরবানির পশু (গরু, ছাগল, মহিষ ইত্যাদি) ট্রাকে পরিবহন করার ক্ষেত্রে তা কোন হাটে বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছে তা (হাটের নাম ও ঠিকানা) ট্রাকের সামনে অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে ব্যানারে দৃশ্যমান করে লেখা থাকতে হবে; যেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা গ্রহণসহ রাস্তায় অন্য কারও দ্বারা বাধাগ্রস্ত বা অসুবিধার সম্মুখীন হতে না হয়। পশু পরিবহনের ক্ষেত্রে অন্য কারও দ্বারা বাধাগ্রস্ত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।
পশুবাহী গাড়ি নিয়ে টানাটানি করলে কঠোর ব্যবস্থা
পশুর হাটে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হাটের বাইরে বা রাস্তায় গরুর গাড়ি বা পশুবাহী কোনো যানবাহন নিয়ে টানাটানি বা জোরজবরদস্তি করলে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (১৯ মে) ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের সম্মেলন কক্ষে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিপণন ও কাঁচা চামড়া বহনকারী যানবাহনের নিরাপত্তাসহ ঢাকা মহানগর এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিশেষ সমন্বয় সভায় এ তথ্য জানান তিনি।
আরও পড়ুন
খালেদা জিয়াকে উপহার দেওয়া সেই কালো মানিক বিক্রির অপেক্ষায়, দাম ২২ লাখ
পশুর হাটে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর ঝুঁকি
চামড়া খাতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা
রাজধানীর ১৯ হাটের ইজারা চূড়ান্ত, সর্বোচ্চ দর দিয়াবাড়ির
তিনি বলেন, শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যানজট মুক্ত রাস্তা নিশ্চিত করতে হাটের সীমানার বাইরে কোনো পশু রাখা যাবে না। জাল টাকা শনাক্তকরণের মেশিন ডিএমপির পক্ষ থেকে পশুর হাটে থাকবে। ঈদের এই সময়ে সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি না করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
কেআর/এমআইএইচএস/