তিস্তা আমাগো পথের ভিখারি করছে
তিস্তা আমাগো পথের ভিখারি করে জমি জিরাত সব গিলে খাচ্ছে, সর্বশান্ত করছে হাজার হাজার পরিবারকে। আমাগো সব শ্যাষ কইরা দিছে। আমরা এক সময় ভালভাবে চলাফেরা করতে পারলেও এখন ভিখারি হয়ে গেলাম। কথাগুলো বলছিলেন বাঁধে আশ্রয় নেয়া জিঞ্জির আলীর ছেলে ফজল শেখ (৭৫)।
তিনি বলেন, টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের তার বাবা জিঞ্জির আলীর নামে জিঞ্জিরপাড়া গ্রামটি হয়েছিল। সেই পরিবারটি বর্তমানে সহায় সম্বহীন হারিয়ে তিস্তার বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।
জিঞ্জির আলীর নাতি আমিনুর রহমান (৫৫) অভিযোগ করে বলেন, চরখড়িবাড়ি এলাকার একটি চক্র নৌকা ভাড়া বৃদ্ধি করে ভাঙন কবলিত পরিবারগুলোকে জিম্মি করে ফেলেছে। প্রতিটি নৌকা ভাড়া বাবদ নেয়া হচ্ছে ৮ হাজার টাকা। একদিকে পরিবারগুলো সর্বত্র হারিয়ে নিঃস্ব অপরদিকে একটি মহল নৌকা ভাড়ার নামে তাদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
একই গ্রামের ইমান আলীর স্ত্রী অমেছা বেগম (৫৫) বলেন, আমাগোর সোনার সংসার ভেঙে পথের ভিখারি করেছে সর্বনাশা তিস্তা। তিস্তা আমাগোর সোনার সংসার একদিনেই শেষ কইরা দিলো।
তিস্তার পানি বিপদসীমার নিচে নেমে আসলেও তিস্তার ভাঙনে সহস্রাধিক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী গ্রামের আরো ৩২টি পবিরার বসতভিটা বিলীন হওয়ায় বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।
সরকারিভাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনা খাবার, চাল বিতরণের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন রান্না করা খাবার বিতরণ করছে। পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্পের উদ্দ্যেগে তিস্তার কলম্বিয়া বাঁধে ৫টি ভ্রাম্যমাণ টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে।
গত ১৫ দিনে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে গেলেও সরকারিভাবে ৮৩০টি পরিবারের তালিকা দেখানো হয়েছে। অবশিষ্ট পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ভাঙনের ফলে টেপাখড়িবাড়ীর একতা চর, জিঞ্জিরপাড়া, টাবুর চর, খালিশা চাপানির খোকার চর ও ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের ফরেস্টের চর ও ছাতুনাম প্রবল ভাঙনে পবিবারগুলোর বসতভিটা, আবাদি জমি, রাস্তঘাট, স্কুলসহ ব্রিজ কালভার্ট বিলীন হয়ে গেছে।
তিস্তার বন্যা ও ভাঙনের কারণে ৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ হাজার ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৫০০ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। এর মধ্যে চরখড়িবাড়ী মধ্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও টাবুর চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টেপাখড়িবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে অধিকাংশ ক্লাশরুমে তিস্তা নদীতে ভেঙে পড়েছে ।
ঝুনাগাছ চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ছাতুনামা ও ভেন্ডাবাড়ী গ্রামে ৭০০ পরিবারের বসতভিটা হাটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ফরেস্টের চর ও ছাতুনামর ২শতাধিক পরিবার তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পশ্চিম ছাতুনামার চরের আশ্রয় নিয়েছে। 
টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন জাগো নিউজকে বলেন, টাবুর চর, জিঞ্জির পাড়া, একতার চরসহ আশেপাশের ১০টি গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার নদী ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তিস্তার বাঁধসহ উচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। উক্ত এলাকার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, তিস্তার ভাঙনে টেপাখড়িবাড়ী চরখড়িবাড়ীসহ ১০টি গ্রামে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। সরকারিভাবে প্রতিটি পরিবারের মাঝে শুকনো খাবারসহ ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। এসব এলাকার জমি জমাসহ বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নায়েমা তাবাচ্ছুম শাহ বলেন, ইতোমধ্যে সরকারিভাবে ৯০ মেট্রিক টন চাল, শুকনা খাবার, নগদ ৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জেলা প্রশাসক বরাদ্দ দিয়েছে।
নীলফামারীর জেলা প্রশাসক জাকির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, তিস্তার বন্যার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। সরকারিভাবে ত্রাণে কোনো ঘাটতি নেই। সকল বিষয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে।
জাহেদুল ইসলাম/এসএস/পিআর