ন্যাড়া পাহাড়ে আবারো সবুজের হাতছানি


প্রকাশিত: ১১:২১ এএম, ১০ আগস্ট ২০১৬

আশির দশকের শেষ দিকেও কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব দিকে তাকালে বড় বড় গাছে ঠাসা জঙ্গল চোখে পড়ত। সেসময় এখানে শিয়াল, বানর, হনুমান, হরিণ, বন মোরগ, হাতি, চিতা ও মেছো বাঘসহ নানা বন্য প্রাণী বিচরণ করতো। অনেক সময় এসব প্রাণী পাহড়ের নিকটবর্তী লোকালয়ে এসে পড়ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে হঠাৎ নির্বিচারে হত্যা করা হয় দীর্ঘ ঐতিহ্যের বিশালাকার এ বৃক্ষরাজি।

অল্প সময়ে পাহাড় থেকে পাহাড় বৃক্ষ উজাড় হয়ে পরিণত হলো ন্যাড়া ভূমিতে। আবাস স্থল হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেল নানা বন্যপ্রাণী। এরপর দখল যজ্ঞ চলতে শুরু করলো পাহাড় ভূমিতে। নানা প্রতিবন্ধকতায়ও থামানো যায়নি পাহাড় দখল ও কর্তন। এখন বোধ জেগেছে শান্তিতে বাঁচতে হলে দরকার সবুজের ছায়া। তাই বন বিভাগের সঙ্গে এতাত্ম হয়ে পাহারা বসানো হচ্ছে গাছ বাঁচাতে। ফলে ন্যাড়া পাহাড়ে আবারো হাতছানি দিচ্ছে সবুজের সমারোহ বৃক্ষরাজি।

কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকার আগেকার ও বর্তমান সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে সদর উপজেলার ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ছৈয়দ আলম এসব কথা বলেন।

Forest

তবে র্দীঘদিন পর হলেও বন বিভাগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় তার মতো পাহাড়ের সান্নিধ্যে বসবাসকারী সব বয়সের মানুষের মাঝে খুশির আমেজ বিরাজ করছে।

কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বনবিভাগের সহায়তায় হাজার হাজার একর বন ভূমিতে গড়ে উঠেছে নীরব সবুজ বিপ্লব। মাইলের পর মাইল বৃক্ষরাজির বিশাল ক্যানভাস বনভুমিকে সাজিয়েছে সবুজের সমারোহে। যতদুর চোখ যায় সবুজের সমারোহে ভরে গেছে কক্সবাজার বন অধিদফতরের সৃজিত সামাজিক বনায়ন।

গত অর্থ বছরে ১৬ হাজার একর বনভূমিতে সৃজন করা হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির চারাগাছ। সামাজিক বনায়নের বিপরীতে ১৬ হাজার ৬১৩ উপকারভোগী নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের সহযোগিতায় বর্তমানে সবুজে সমারোহে ভরে উঠেছে বনায়নগুলো।

মহাসড়কের ১৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠা দৃষ্টিনন্দন বনায়ন এখন পর্যটক-দর্শণার্থীদের কাছে বিনোদনের বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভ্রমণে আসা পর্যটকদের অনেকে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে সড়কের উভয় পাশের সবুজ বনায়নে কিছুক্ষণের জন্য প্রকৃতির অপার স্বাদ ও ছবি ধারণ করে নিচ্ছেন নিয়মিত।

বনবিভাগ সূত্র মতে, গত ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের অধীনে ১৩ হাজার ১৫৮ একর বনভূমিতে চারা রোপন করা হয়েছে ৯০ লাখ। এর মধ্যে টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার সদর রেঞ্জের আওতাধীন বনবিটগুলোর উচ্ছেদকৃত ২১০ একর বনভূমিতে রোপন করা হয় ২৯ লাখ ৭৫ হাজার চারাগাছ। রামু দুছড়ি এলাকায় ৮শ একর বনভূমিতেও অনুরূপ চারা রোপন করা হয়। এসব বনায়নের বিপরীতে ১৪ হাজার ৪৮ জন উপকারভোগী নিয়োগ করা হয়।

সূত্র মতে, কক্সবাজার উত্তর বনবিভাগের ফুলছড়ি, ফাসিয়াখালী, রাজঘাট, ঈদগাঁও, ঈদগড়, মেহেরঘোনা, বাঁকখালী, জোয়ারিয়ানালা ও সদর রেঞ্জের বিভিন্ন বিটে ২ হাজার ৯৬১ একর বনভূমিতে বনায়ন সৃজন করা হয়। তৎমধ্যে ৭০১ একর বনভূমিতে পুনঃবনায়ন (দ্বীয় আর্বত বাগান) করা হয়েছে। নিয়োগ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৬৫ জন উপকারভোগী।

এসব বনাঞ্চলে ১৯৫২-৫৩ সাল থেকে শুরু করে এখনও অব্যাহত রয়েছে বনায়ন সৃজনের কাজ। একই সঙ্গে চলছে বনাঞ্চলের মূল্যবান বৃক্ষরাজি রক্ষায় বনকর্মী ও বন জায়গীরদারদের প্রাণপণ প্রচেষ্টাও। বন নির্ভরশীলদের বননির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প জীবিকায়নের কাজ করছে বেশ কয়েকটি এনজিও।

Forest

উত্তর বনবিভাগের মেহেরেঘোনা রেঞ্জের চারটি বিটের আওতায় সৃজিত সামাজিক বনায়নের গাছ রক্ষার্থে উপকার ভোগীদের নিয়ে সম্প্রতি এক বৈঠক আয়োজন করা হয়। ঈদগাঁওস্থ মেহেরঘোনা রেঞ্জ কার্যালয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা একেএম আতা এলাহীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (কক্সবাজার-উত্তর) কেরামত আলী মলি­ক।
 
তিনি জানান, বনবিভাগের অধীনে ১৩ কিলোমিটার সড়কে সামাজিক বনায়নে ১৩ হাজার চারা রোপন করা হয়েছে। পাহাড়ে বনায়ন করা হয়েছে কয়েক হাজার একর। এতেউপকার ভোগী করা হয়েছে সহস্রাধিক অধিবাসীকে।

কেরামত আলী মলি­কের মতে, সামাজিক বনায়ন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সহায়তা দিচ্ছে স্বনির্ভর হতে। বন বিভাগ অংশীদারদের খাদ্য, পশুখাদ্য, জ্বালানী, আসবাবপত্র ও মূলধনের চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বন ও বনভূমি রক্ষায় নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে বনকর্মীদের পাশাপাশি অংশীদাররাও। সৃজিত বনায়নগুলো দিনদিন বেড়ে উঠছে। আর যেসব বনায়ন পরিপূর্ণতা পেয়েছে তা কেটে নতুন বনায়ন করা হচ্ছে। এতে করে দেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে, স্থানীয় জনগণও উপকৃত হচ্ছে। সরকারও আয় করছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। তাই এসব বনকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে গণ্য করতে উপকারভোগীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আলী কবির জানান, স্থানীয় দরিদ্র জনগণকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করে পরিচালিত সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমে সুফল পাচ্ছে উপকারভোগীরা।

সামাজিক বনায়নের ফলে অংশীদার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ভূমিহীন, দরিদ্র, বিধবা ও দুর্দশাগ্রস্থ গ্রামীণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত হচ্ছে।

সায়ীদ আলমগীর/এফএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।